‘আতঙ্কের নাম DH-69’
চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় ‘DH-69’ নামে একটি কিশোর গ্যাংয়ের প্রকাশ্য শোডাউন ও সামাজিক মাধ্যমে নিজেদের ‘আতঙ্কের নাম DH-69’ হিসেবে প্রচার করাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় জনমনে উদ্বেগ ও আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি বিপুল সংখ্যক সদস্য নিয়ে লাল রঙের পতাকা হাতে কেরানীহাট এলাকায় মিছিল ও শক্তি প্রদর্শন করে গ্রুপটির সদস্যরা। পরে সেই শোডাউনের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। টিকটকে তাদের সদস্যদের আপলোড করা কয়েকটি ভিডিওতে দেশীয় অস্ত্রসদৃশ বস্তু বহন করতে দেখা গেছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা, অভিভাবক, ব্যবসায়ী এবং সচেতন মহলের অনেকে বলছেন, কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উদ্বেগজনক আকার ধারণ করেছে। এর মধ্যে কোনো গ্রুপ যদি প্রকাশ্যে নিজেদের ‘আতঙ্কের নাম’ হিসেবে পরিচিত করার চেষ্টা করে, তাহলে তা শুধু সামাজিক শৃঙ্খলার জন্য নয়, কিশোরদের ভবিষ্যতের জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি সাতকানিয়ার কেরানীহাটের সী-ওয়ার্ল্ড রেস্টুরেন্টের সামনে জড়ো হন ওই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। পরে একটি বড় লাল রঙের পতাকা হাতে কয়েক ডজন তরুণ ও কিশোরকে একসঙ্গে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে মিছিল-শোডাউন করতে দেখা যায়। তাদের হাতে থাকা লাল রঙের পতাকায় বড় অক্ষরে লেখা ছিল ‘DH-69’। দলবদ্ধভাবে মহাসড়কে অবস্থান, স্লোগান এবং শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে তারা নিজেদের উপস্থিতি জানান দেয়।
স্থানীয়রা জানান, সাধারণত রাজনৈতিক কর্মসূচি, সামাজিক অনুষ্ঠান বা সাংস্কৃতিক আয়োজন ছাড়া এত বড় সংখ্যক তরুণকে একই ব্যানারে প্রকাশ্যে শোডাউন করতে দেখা যায় না। ফলে অনেকেই বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবে নেননি। শোডাউনের সময় রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষজন কৌতূহল ও শঙ্কা নিয়ে ঘটনাটি পর্যবেক্ষণ করেন।
একজন ব্যবসায়ী বলেন, প্রথমে ভেবেছিলাম কোনো সংগঠনের অনুষ্ঠান। পরে দেখি অনেকেই ভিডিও করছে, ছবি তুলছে। পরে সামাজিক মাধ্যমে দেখি ওরা নিজেদের DH-69 নামে পরিচয় দিচ্ছে। তখন বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।
শোডাউনের পরপরই ফেসবুক, টিকটকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে গ্রুপটির সদস্যরা নিজেদের কর্মকাণ্ডের ভিডিও পোস্ট করে বিভিন্ন ধরনের ক্যাপশন ব্যবহার করেন। কয়েকটি পোস্টে স্পষ্টভাবে লেখা হয়—‘আতঙ্কের নাম DH-69’।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অনেক সদস্য নিজেদের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকেও একই ধরনের ছবি ও ভিডিও শেয়ার করেছেন। কেউ কেউ গ্রুপের নাম সম্বলিত পোস্টারধর্মী ছবি ব্যবহার করেছেন। আবার অনেকে ভিডিও সম্পাদনার মাধ্যমে নিজেদের শক্তিশালী বা ভয়ংকর হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন।
সচেতন মহলের মতে, সামাজিক মাধ্যমে ‘আতঙ্ক’ শব্দ ব্যবহার করে নিজেদের প্রচার করা একটি নেতিবাচক বার্তা বহন করে। এটি অন্য কিশোরদের মধ্যেও একই ধরনের গ্রুপ তৈরির আগ্রহ সৃষ্টি করতে পারে।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিও নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে দেশীয় অস্ত্র প্রদর্শনের অভিযোগকে কেন্দ্র করে। ভিডিওগুলোতে কয়েকজনের হাতে ধারালো অস্ত্রসদৃশ বস্তু দেখা গেছে বলে দাবি করছেন স্থানীয়রা।
একজন অভিভাবক বলেন, কিশোর বয়সী ছেলেদের হাতে যদি অস্ত্রসদৃশ কিছু দেখা যায়, সেটা অবশ্যই চিন্তার বিষয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচিত বিষয়টি খতিয়ে দেখা।
স্থানীয়দের মতে, অস্ত্র প্রদর্শনের মতো দৃশ্য ব্যবহার করে ভয়ভীতি সৃষ্টির চেষ্টা সামাজিকভাবে ক্ষতিকর।
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, DH-69 নামটি সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি দেখা যাচ্ছে। গ্রুপটির সদস্যদের বেশিরভাগই কিশোর ও তরুণ বয়সী। তারা মূলত নিজেদের মধ্যে একটি আলাদা পরিচয় তৈরি করতে এই নাম ব্যবহার করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে গ্রুপটির আনুষ্ঠানিক কোনো কাঠামো, নিবন্ধন বা বৈধ সংগঠন হিসেবে অস্তিত্বের তথ্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয়ভাবে এটি একটি কিশোর গ্যাং বা অনানুষ্ঠানিক তরুণদের দল হিসেবেই পরিচিতি পেয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের গ্রুপগুলো সাধারণত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক পরিচিতি তৈরির মাধ্যমে সদস্য সংগ্রহ করে। পরে নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের জন্য দলবদ্ধ ছবি, ভিডিও এবং শোডাউন আয়োজন করে।
কেরানীহাটের বাসিন্দাদের অনেকেই বলছেন, এ ধরনের কিশোর গ্যাংয়ের প্রকাশ্য শক্তি প্রদর্শনের ফলে বিষয়টি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
একজন প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, আমরা চাই আমাদের ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করুক। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে অনেকেই গ্রুপ বানিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার চেষ্টা করছে। এটা ভালো লক্ষণ নয়।
স্থানীয় এক শিক্ষক বলেন, কিশোর বয়সে অনেক সময় বন্ধুবান্ধবের প্রভাবে ভুল পথে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোর গ্যাং কোনো একক এলাকার সমস্যা নয়। দেশের বিভিন্ন শহর ও উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন নামে কিশোর গ্রুপ গড়ে উঠছে। এসব গ্রুপের সদস্যরা নিজেদের পরিচিতি বাড়াতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে থাকে।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, গ্রুপের সদস্যরা একসঙ্গে ছবি তোলা, ভিডিও তৈরি করা, মোটরসাইকেল শোডাউন, উচ্চ শব্দে সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়ে।
সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, সামাজিক স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা, পারিবারিক নজরদারির ঘাটতি, বেকারত্ব, অনলাইন সংস্কৃতির নেতিবাচক প্রভাব এবং সহপাঠীদের চাপ—এসব কারণে অনেক কিশোর এমন গ্রুপের প্রতি আকৃষ্ট হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিশোরদের আচরণে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। অনেকেই ‘ভিউ’, ‘লাইক’ ও ‘ফলোয়ার’ বৃদ্ধির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বা বিতর্কিত কনটেন্ট তৈরি করে।
কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, ভয়ভীতি, দাপট কিংবা ক্ষমতার প্রদর্শনমূলক ভিডিও দ্রুত ভাইরাল হয়। ফলে অন্যরাও একই ধরনের ভিডিও তৈরি করতে উৎসাহিত হয়।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, কিশোর বয়সে আত্মপ্রকাশের প্রবল ইচ্ছা থাকে। সেই ইচ্ছাকে ইতিবাচক পথে পরিচালিত না করতে পারলে তারা নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে পারে।
স্থানীয় অভিভাবকরা বলছেন, সন্তানরা কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে এবং সামাজিক মাধ্যমে কী ধরনের কার্যক্রমে যুক্ত হচ্ছে—এসব বিষয়ে নজরদারি প্রয়োজন।
একজন অভিভাবক বলেন, “শুধু স্কুলে পাঠালেই দায়িত্ব শেষ হয় না। সন্তান মোবাইলে কী করছে সেটাও দেখতে হবে।”
শিক্ষাবিদদের মতে, সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা, নিয়মিত কথোপকথন এবং মানসিক সহায়তা প্রদান কিশোর গ্যাংয়ে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
স্থানীয়দের দাবি, সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ছবিগুলো দ্রুত যাচাই করা উচিত। যদি সেখানে অস্ত্র প্রদর্শন, জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি বা আইনবিরোধী কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
কেঁওচিয়া ইউনিয়ন জামায়াতের সেক্রেটারি মো. জাহেদুল ইসলাম বলেন, কিশোর ও তরুণদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার বিকল্প নেই। কোনো ধরনের সহিংসতা, অস্ত্র প্রদর্শন বা ভয়ভীতি প্রদর্শনের সংস্কৃতি সমাজের জন্য ক্ষতিকর। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত অভিযোগগুলো যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
জানতে চাইলে সাতকানিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ভিডিও ও ছবির বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। এগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। যদি অস্ত্র প্রদর্শন, জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর মতো কোনো কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে বিবেচনা করা হবে না।













