সরকারকে আর বেশি সময় নয়, পরিবর্তন চাই: ডা. শফিকুর রহমান
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারকে গণভোটের রায় বাস্তবায়নে আর বেশি সময় দেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, “সময় খুব সীমিত। সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। এই সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন না এলে পরিণতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।”
শনিবার (১৩ জুন) বিকেলে চট্টগ্রাম নগরের লালদীঘি ময়দানে ১১–দলীয় ঐক্যের বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জনদুর্ভোগ নিরসন এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের দাবিতে এ সমাবেশের আয়োজন করা হয়।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সরকারকে জনগণের রায় ও গণভোটের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে হবে। স্বেচ্ছায় তা বাস্তবায়ন না করলে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ১৯৯৬ সালের মতো রূপ নিতে পারে। তিনি বলেন, “যেভাবে ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু করতে সরকার বাধ্য হয়েছিল, এবারও জনগণের দাবি উপেক্ষা করা হলে একই ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। ভালোয় ভালোয় জনগণের দাবি মেনে নিন, মানুষকে রাজপথে নামতে বাধ্য করবেন না।”
নেতা-কর্মীদের জেল কিংবা ফাঁসির ভয় দেখিয়ে আন্দোলন দমিয়ে রাখা যাবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “দেশ ও জনগণের স্বার্থে আমরা বারবার কারাবরণ করতে এবং প্রয়োজনে জীবন দিতেও প্রস্তুত। মনে রাখতে হবে, জেলের তালা কিংবা চাবির মালিক—কেউই স্থায়ী নয়।”
সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, বর্তমান সরকারে একজন ‘সর্ববিষয় বিশারদ’ মন্ত্রী রয়েছেন, যিনি প্রায় সব মন্ত্রণালয় পরিচালনা করেন। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যও তাঁকেই দিতে হয়। তিনি অভিযোগ করেন, প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন জনসভায় ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপন করছেন, যা রাষ্ট্রের জন্য বিব্রতকর।
কক্সবাজারে প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বিরোধী দল বাজেটে মাদক ও নেশাজাতীয় দ্রব্যের ওপর কর বৃদ্ধির প্রতিবাদে মিছিল করেছে—এমন দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা। “বাজেটের সমালোচনা করা গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। বিরোধী মতকে সম্মান করার মানসিকতা থাকতে হবে,” বলেন তিনি।
জাতীয় সংসদে কথা বলার পরিবেশ নেই উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “সংসদে কথা বলার সুযোগ না পেয়ে আমরা জনগণের সংসদ, অর্থাৎ রাজপথে চলে এসেছি।” তিনি দাবি করেন, দেশের ১৮ কোটি মানুষ জাতীয় স্বার্থ ও সীমান্ত রক্ষায় সজাগ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠার পর মানুষ চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি কমার আশা করেছিল। কিন্তু বাস্তবে চাঁদাবাজি বেড়েছে এবং দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে।

সমাবেশে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, বর্তমান বাজেটে দুর্নীতি, লুটপাট ও ব্যাংক খাতের অনিয়ম বন্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই। তিনি অভিযোগ করেন, এই বাজেট বাস্তবতা বিবর্জিত এবং এর বাস্তবায়নে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক ঋণের প্রয়োজন হবে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, “দেশে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও প্রয়োজনীয় সংস্কার ছাড়া দুর্নীতি ও লুটপাট বন্ধ করা সম্ভব নয়।” তিনি আরও অভিযোগ করেন, ইসলামী ব্যাংককে আবারও এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে, যা জনগণ মেনে নেবে না।
জাতীয় ক্রিকেট দলের খেলোয়াড় নাঈম হাসানকে পুলিশের মারধরের অভিযোগের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, গণভোটের রায় অনুযায়ী পুলিশ, দুদক ও বিচার বিভাগে সংস্কার জরুরি। “পুলিশ সংস্কার না হওয়ায় সাধারণ মানুষের ওপর আবারও নির্যাতন শুরু হয়েছে। সরকার যদি স্বৈরাচারী পথে হাঁটে, তবে জনগণও গণ-অভ্যুত্থানের পথ বেছে নিতে বাধ্য হবে,” বলেন তিনি।
সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়েও বক্তব্য দেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, “কাঁটাতার ও গুলির মাধ্যমে বন্ধুত্ব প্রতিষ্ঠা হয় না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে জনগণ কখনো আপস করবে না।”

সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। মানুষ নিরাপদ বোধ করছে না। চুরি, ডাকাতি ও অপরাধ দমনে সরকারকে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদীয় পার্টির সেক্রেটারি ও চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ শাহজাহান চৌধুরী, কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ শাহজাহান, জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, আমার বাংলাদেশ পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান এ কে এম আনোয়ারুল ইসলাম এবং ১১–দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদসহ অন্যান্য নেতারা।









