সাতকানিয়ায় আদালতের আদেশে দায়িত্বে ফিরলেন আওয়ামীপন্থী দুই চেয়ারম্যান, এলাকায় বাড়ছে উত্তেজনা
চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার দুটি ইউনিয়ন পরিষদে আদালতের নির্দেশে আওয়ামী লীগ মনোনীত দুই চেয়ারম্যানের পুনর্বহালকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা, উদ্বেগ ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দায়িত্বচ্যুত হওয়া আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ জনপ্রতিনিধিদের প্রশাসনিক ক্ষমতায় ফিরে আসার প্রক্রিয়া এলাকায় নতুন করে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) সোনাকানিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জসিম উদ্দিন এবং এর আগে ৩১ মে খাগরিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আক্তার হোসেন আদালতের আদেশের ভিত্তিতে আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতাসহ দায়িত্ব পালনের সুযোগ পান। এরপর থেকেই স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, খাগরিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আক্তার হোসেনের আবেদনের পর মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী তাকে পুনরায় ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক ও আর্থিক দায়িত্ব প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়। আদালতের আদেশে পূর্ববর্তী স্থগিতাদেশ ছয় মাসের জন্য স্থগিত হওয়ায় তিনি পুনরায় দায়িত্ব পালনের সুযোগ পান।
একইভাবে সোনাকানিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জসিম উদ্দিনও হাইকোর্টের শরণাপন্ন হয়ে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব ফিরে পান। আদালতের নির্দেশনার পর সংশ্লিষ্ট প্রশাসন তাকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়।
এ বিষয়ে সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, “আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন ছাড়া প্রশাসনের অন্য কোনো এখতিয়ার নেই। আদালতের আদেশ অনুযায়ী দুই চেয়ারম্যানকে আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়েছে। এর আগে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নগুলোতে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দায়িত্ব পালন করছিলেন।”
স্থানীয় সূত্র বলছে, আক্তার হোসেন দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমানের ঘনিষ্ঠ অনুসারী হিসেবে পরিচিত ও উপজেলা আওয়ামী লীগের শ্রম ও কর্মসংস্থান বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে খাগরিয়ায় ছাত্রলীগ ও আওয়ামীলীগ সক্রিয় হওয়ার পেছনে আক্তার হোসেনের ভূমিকায় বেশি রয়েছে বলে জানা যায়। গত কয়েক সপ্তাহ আগে খাগরিয়ায় ছাত্রলীগের ধান কাটার একটি ছবি কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের ফেসবুক পেজে পোস্ট করলে এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। এছাড়া একাধিক কর্মসূচি পালনের ছবিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। আক্তার হোসেনের নেতৃত্বে খাগরিয়ায় আওয়ামী লীগসহ অঙ্গ সংগঠন সক্রিয় হচ্ছে।
অন্যদিকে জসিম উদ্দিনকে সাতকানিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক কুতুব উদ্দিন চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহচর হিসেবে দেখা হয়। জানা যায়, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতার ওপর আক্রমণের অভিযোগ গত বছরের ২২ এপ্রিল রাতে চট্টগ্রামের সদরঘাট এলাকা থেকে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। দীর্ঘ কারাভোগের পর সে জামিন বের হন।
সাবেক চেয়ারম্যান জসিমের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের ৪ নভেম্বর লোহাগাড়া উপজেলার পুরাতন থানা এলাকার মফিজুর রহমানের ছেলে মোহাম্মদ মোমেন হোসেন জয় বাদী হয়ে বিস্ফোরক আইনে সদরঘাট থানায় এ মামলা দায়ের করেন। মামলায় ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট সকাল ১১টা থেকে ৫ আগস্ট রাত আনুমানিক ১০টা পর্যন্ত সদরঘাট থানার সিটি কলেজের সামনে থেকে ইসলামিয়া কলেজের মোড় পর্যন্ত বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতার ওপর আক্রমণের অভিযোগ করা হয়।
আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যানদের পুনর্বহালকে স্থানীয় রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন অনেকে। তাদের পুনর্বহালে স্থানীয় একাধিক রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীদের জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের অনেক জনপ্রতিনিধি প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতায় দায়িত্বের বাইরে চলে যান। সেই প্রেক্ষাপটে আদালতের মাধ্যমে একের পর এক জনপ্রতিনিধির দায়িত্বে ফেরার ঘটনাকে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা হিসেবে বিবেচনা করছেন স্থানীয় পর্যবেক্ষকরা।
খাগরিয়ায় চেয়ারম্যান আক্তার হোসেন দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। গত ৩১ মে তিনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের চেয়ারে বসার পর বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়। স্থানীয়দের একটি প্রতিনিধি দল তাকে গ্রেপ্তারের দাবিতে সাতকানিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন।
অন্যদিকে সোনাকানিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন এলাকায় ফিরবেন—এমন খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয়দের পক্ষ থেকে মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
দুই চেয়ারম্যান ইউনিয়ন পরিষদে নিয়মিত অফিস শুরু করলে সমর্থক ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে সংঘাতের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় সাতকানিয়ার বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত হামলায় সরাসরি জড়িত বলে এই দুই চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে ইউএনও খোন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, “আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি বা কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।”
আইনজীবীদের মতে, আদালতের আদেশে দায়িত্ব ফিরে পাওয়া কোনো জনপ্রতিনিধিকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বিচার করা সমীচীন নয়। আদালত যদি আইনগতভাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেন, তবে তা বিচার বিভাগের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ। তবে মাঠপর্যায়ে জনমত ও রাজনৈতিক বাস্তবতা কী অবস্থান নেয়, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
স্থানীয় সূত্র আরও জানিয়েছে, সাতকানিয়ার বিভিন্ন ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ সমর্থিত আরও কয়েকজন সাবেক চেয়ারম্যান ও জনপ্রতিনিধি আদালতের মাধ্যমে দায়িত্ব ফিরে পাওয়ার লক্ষ্যে আইনি প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছেন। ফলে আগামী দিনে উপজেলার আরও কয়েকটি ইউনিয়ন পরিষদে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ভাষ্য, আদালতের নির্দেশে জনপ্রতিনিধিদের প্রত্যাবর্তন কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এর সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক অভিঘাতও রয়েছে। রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর সাতকানিয়ায় এই প্রত্যাবর্তন স্থানীয় ক্ষমতার ভারসাম্য, রাজনৈতিক সমীকরণ এবং মাঠের রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ ছড়িয়ে দিতে পারে।










