এবারের এসএসসি পরীক্ষায় লোহাগাড়ায় প্রথম স্থান অর্জনে বীর বিক্রম জয়নুল আবেদীন উচ্চ বিদ্যালয়
রায়হান সিকদার,লোহাগাড়াঃ
চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের একদম শেষ প্রান্তে অঝোঁপড়া গায়ে অবস্থিত বীর বিক্রম জয়নুল আবেদীন উচ্চ বিদ্যালয়। এবারে লোহাগাড়া উপজেলায় শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী সাফল্য অর্জন করেছে এই প্রতিষ্ঠানটি।লোহাগাড়া উপজেলায় ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে পাসের হারে শীর্ষে রয়েছে।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের প্রকাশিত প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলাফল অনুযায়ী জানা গেছে, ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে ৮৭.৫০শতাংশ পাসের হার নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি লোহাগাড়া উপজেলায় শীর্ষস্থান অর্জন করেছে।
এবারের এসএসসি পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানটি থেকে মোট ৪০ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। এর মধ্যে নিয়মিত ৩৫জন শিক্ষার্থীর সবাই পাস করেছে।
বীর বিক্রম জয়নুল আবেদীন উচ্চ বিদ্যালয় ১০ম শ্রেনীর শিক্ষার্থী তাসকিয়া জায়তুন বলেন, “আমাদের শিক্ষকদের নিয়মিত পাঠদান, কঠোর পরিশ্রম এবং অভিভাবকদের সহযোগিতার কারণেই ভাল ফলাফল অর্জন সম্ভব হয়েছে। আমাদের অঝোঁপড়া গায়ে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি শীর্ষ স্থান অর্জন করায় আমরা অনেক খুশী হয়েছি। ভবিষ্যতেও এই বিদ্যালয় সুনাম ধরে রাখবে।
বীর বিক্রম জয়নুল আবেদীন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এবারে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া মিতিলা জান্নাত নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, “ফল প্রকাশের পর আমরা সবাই অনেক আনন্দিত। আমাদের শিক্ষকরা শুধু পরীক্ষার প্রস্তুতিই দেননি, পড়াশোনার পাশাপাশি নিয়ম-শৃঙ্খলা ও ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষাও দিয়েছেন। আমাদের জন্য স্পেশাল কোচিং এর ব্যবস্থা করেছেন। স্কুলের প্রধান শিক্ষকসহ সকল শিক্ষকদের পরিশ্রমের কারণে দুর্গম পাহাড়ি জনপথে বিস্তৃত এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি লোহাগাড়ায় এক নাম্বার স্থান অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।এই ফলাফল আমাদের ভবিষ্যতে আরও ভালো করার অনুপ্রেরণা দেবে।
আবদুল মালেক নামের একজন অভিভাবক বলেন, বীর বিক্রম জয়নুল আবেদীন উচ্চ বিদ্যালয় এবারের এসএসসি পরীক্ষায় প্রথম স্থানে, আমাদের এই অঝোঁপড়া গায়ে। এমন সাফল্যে আমরা অভিভাবকরা অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত। শিক্ষকদের আন্তরিকতা, নিয়মিত পাঠদান এবং শিক্ষার্থীদের পরিশ্রমের কারণেই এই ভালো ফলাফল সম্ভব হয়েছে।পানত্রিশা গ্রামের মতো এলাকায় এমন মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আমাদের সন্তানদের জন্য বড় একটি সুযোগ। আশা করি, ভবিষ্যতেও এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আরও ভালো ফলাফল অর্জন করে উত্তরাঞ্চলের শিক্ষাক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এলাকার বাসিন্দা রেজাউল বাহার রাজা বলেন, “শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষকদের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও অভিভাবকদের সহযোগিতায় এই সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়েছে। আগামীতে আরও ভালো ফলাফল অর্জনে আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাবো। এবাবের এসএসসি পরীক্ষায় ফলাফলে লোহাগাড়ায় শীর্ষ স্থান অর্জন করায় আমরা এলাকাবাসি সত্যিই অনেক আনন্দিত ও গর্বিত।
এই বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, চুনতি ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান আলহাজ্ব সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বিদ্যালয় এবারে লোহাগাড়ার শীর্ষ স্থান অর্জন করায় মহান আল্লাহর দরবারে শোকরিয়া জ্ঞাপন করছি। আমাদের পানত্রিশা গ্রাম দুর্গম এলাকা, পিছিয়ে পড়া এই এলাকা। এলাকার আপামর জনসাধারণ ও সকল শিক্ষার্থীরা এই প্রতিষ্ঠানকে নিজের প্রতিষ্ঠান হিসেবে গ্রহণ করেছে।বিদ্যালয়ে অধিকাংশ শিক্ষার্থীরাই কৃষক, শ্রমিক ও দিনমজুরের ছেলে। তাদের মধ্যে একটা প্রতিযোগিতা ও দৃঢ় প্রত্যয় কাজ করেছে। নিজেদেরকে গড়ে তোলা ও প্রতিষ্ঠিত করার জন্য একটা প্রতিযোগিতা কাজ করেছি।যার কারণে আজকের এই ফলাফল অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। তিনি আরও বলেন, স্কুলটি প্রতিষ্ঠার পর প্রতি বারে শতভাগ পাস করে আসছে। তবে গতবারে শিক্ষকদের সাথে দুরুত্ব ও অবহেলার কারণে একটু পিছিয়ে থাকলেও পুণরায় ফলাফল ধরে রাখতে সক্ষম হয়।
তিনি আরও বলেন, ভাল ফলাফলের জন্য প্রত্যেক শিক্ষার্থীর ডোর টু ডোর গিয়ে তদারিকি করতে শিক্ষকদের কে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। উঠান বৈঠক করা হয়েছে। বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষকরা গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আগামী এই বিদ্যালয়ে উপজেলা ছাড়িয়ে জেলা পর্যায়ে শীর্ষ স্থান অর্জন করতে সক্ষম হবে। তাই তিনি সকল জনসাধারণ,উপজেলা প্রশাসন ও গণমাধ্যম কর্মীসহ সবার সহযোগিতা কামনা করেন।
বীর বিক্রম জয়নুল আবেদিন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শওকত ইসলাম বলেন,আমাদের এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে। ১০ম শ্রেণীতে পড়ার সময় বিদ্যালয়ের ছাত্রদেরকে আমরা বাধ্যতামূলক হোস্টেলে নিয়ে আসছি।তাদেরকে আমাদের শিক্ষকরা সঠিকভাবে গাইডলাইন দিয়েছে। গণিত, ইংরেজী বিষয়ে গুরুত্ব সহকারে শিক্ষকরা পড়াতেন। স্কুলের ছাত্রীদের বাড়িতে গিয়ে হোম ভিজিট করতাম। তাদেরকে স্পেশাল কোচিং এর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। মাসিক মূল্যায়ন নেওয়া হয়। তিনি আরও বলেন, আমাদের নির্দেশনা ছিল, নির্বাচনী পরীক্ষায় পাস না করে অনুমতি দেওয়া হবেনা।শিক্ষার্থীরা সবাই নির্বাচনী পরীক্ষায় পাস করেছে। যার কারণে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় এই কাঙ্খিত ফলাফল এসেছে।আর বিদ্যালয় থেকে যারা এসএসসি পরীক্ষায় পাস করেছে তারা কেউ দিন মজুর,কৃষকদের ছেলে। আমরা দেখেছি অনেক পরিবারে বই পুস্তকের গন্ধ ছিলনা, অঝোঁপড়া গায়ে আমরা তাদেরকে পড়াচ্ছি। অভিভাবকদেরকে নিয়ে উঠান বৈঠক করেছি।অভিভাবকদের মধ্যে অনেকেই পড়ালেখা না করলে সহযোগিতা পেয়েছি। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ফলাফল, পরিশ্রম আমার বিদ্যালয়ের শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের কৃতিত্বের দাবিদার মনে করছি। এই অর্জন আমাদের পুরো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবারের জন্য আনন্দ ও গর্বের। আলহামদুলিল্লাহ, লোহাগাড়া উপজেলায় আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রথম স্থান অর্জন করেছে। এই বিদ্যালয় আগামীতেও লোহাগাড়া উপজেলার পাশাপাশি জেলাতেও সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত করাই আমাদের লক্ষ্য।
বীর বিক্রম জয়নুল আবেদীন উচ্চ বিদ্যালয় এখন শিক্ষাক্ষেত্রে সাফল্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।











