‘সমন্বয়ক’ পরিচয়ে বেপরোয়া মানিক
চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় সমন্বয়ক পরিচয় ব্যবহার করে একটি চক্রের বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠেছে। নিজেদের সমন্বয়ক পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন যানবাহনে উঠে চালক ও সহকারীদের হেনস্তা, কাউকে আওয়ামী লীগের দোসর আখ্যা দিয়ে সামাজিকভাবে হেয় করা, অবৈধ যানবাহন আটকের পর ট্রাফিক পুলিশের কাছে তদবির করে ছাড়িয়ে নেওয়াসহ নানা কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে চক্রটির বিরুদ্ধে। এসব ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবহন শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রশক্তির সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব মো. সাঈদ হোসেন মানিক। সম্প্রতি প্রকাশিত এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে পাঁচ বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে আলোচনায় আসেন তিনি। এরপর থেকে তাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছিল। এর মধ্যেই ট্রাফিক পুলিশের কাছে তদবির করে একটি মোটরসাইকেল ছাড়িয়ে নেওয়ার অভিযোগ নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সন্ধ্যায় সাতকানিয়ার ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকা কেরানীহাটে অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান ও কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করছিল ট্রাফিক পুলিশ। এ সময় কয়েকটি মোটরসাইকেল আটক করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পরীক্ষা করা হচ্ছিল। খবর পেয়ে সেখানে যান ছাত্রশক্তি নেতা মো. সাঈদ হোসেন মানিক। অভিযোগ রয়েছে, তিনি একটি মোটরসাইকেল ছাড়িয়ে দিতে ট্রাফিক পুলিশের কাছে তদবির করেন।
তবে ট্রাফিক ইনচার্জ মো. মাহবুব তাকে জানান, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও বৈধ ডকুমেন্টস থাকলে মোটরসাইকেল ছেড়ে দেওয়া হবে। পরে সংশ্লিষ্ট চালক মোটরসাইকেলের কাগজপত্র নিয়ে এলেও তার কাছে ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিল না। এ কারণে ট্রাফিক পুলিশ মামলা দেওয়ার উদ্যোগ নিলে সেখানে সমন্বয়ক পরিচয় দেন সাঈদ হোসেন মানিক। অভিযোগ রয়েছে, নিজের সমন্বয়ক পরিচয়ে প্রভাব খাটিয়ে শেষ পর্যন্ত মোটরসাইকেলটি ছাড়িয়ে নেন তিনি।
ঘটনাটি জানতে পেরে সেখানে উপস্থিত হন এ প্রতিবেদক। এ সময় কেরানীহাট পুলিশ বক্সের সামনে বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে সাঈদ হোসেন মানিক কোনো কথা বলেননি। তবে তার সঙ্গে থাকা কয়েকজন যুবক এ প্রতিবেদককে পুলিশের সঙ্গে কথা বলার অনুরোধ করেন।
পরে কেরানীহাট পুলিশ বক্সের ট্রাফিক ইনচার্জ মো. মাহবুবের কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বিব্রতবোধ করেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘আসলে কী আর বলব ভাই। সে সমন্বয়ক পরিচয় দিল, আমার তো কিছু করার নেই।’
ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব পালনের সময় এ ধরনের পরিচয় ব্যবহার করে কেউ তদবির করলে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে পুলিশ সদস্যরা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বিশেষ করে চালকের লাইসেন্স না থাকার মতো বিষয়েও যদি পরিচয় ও প্রভাবের কারণে ছাড় দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়, তাহলে সড়কে আইন প্রয়োগের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া প্রশ্নের মুখে পড়ে।
মিনিবাসে মব সৃষ্টি ও চালক-সহকারীকে হেনস্তার অভিযোগ
সাঈদ হোসেন মানিকের বিরুদ্ধে গণপরিবহনে মব সৃষ্টি করে চালক ও সহকারীদের হয়রানি করার অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয় পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে চট্টগ্রাম থেকে আগত মিনিবাস আটকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের কথিত অভিযোগ তুলে চালক ও সহকারীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করা হয়। কখনো তাদের হেনস্তা করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ থাকলে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু ব্যক্তিগত উদ্যোগে গাড়ি আটকে চালক-সহকারীকে হেনস্তা কিংবা জনসমাগম তৈরি করে চাপ প্রয়োগের ঘটনা ঘটলে তা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার শামিল হতে পারে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের কারণে পরিবহন শ্রমিকেরা অনেক সময় প্রতিবাদ করার সাহস পান না। আবার সাধারণ যাত্রীরাও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখে পড়ার আশঙ্কায় আতঙ্কে থাকেন।
পুলিশের বিরুদ্ধে বক্তব্য, বাড়ছে বিতর্ক
বিভিন্ন সময় সাতকানিয়া থানার সামনে গিয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে সাঈদ হোসেন মানিকের বিরুদ্ধে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, থানার সামনে একটি ব্যানার নিয়ে দাঁড়িয়ে তিনি পুলিশের বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালন না করার অভিযোগ তুলছেন।
পুলিশের কার্যক্রম নিয়ে নাগরিকদের প্রশ্ন তোলার অধিকার রয়েছে। পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা বা অনিয়ম থাকলে তার সমালোচনা এবং প্রতিকার দাবি করাও স্বাভাবিক। তবে সেই সমালোচনার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজে বাধা সৃষ্টি, জনসমাগম তৈরি করে চাপ প্রয়োগ কিংবা ব্যক্তিগত পরিচয় ব্যবহার করে আইন প্রয়োগে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠলে তা আলাদা করে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
হামলা-মবের ঘটনায় চাপে পুলিশ
গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশকে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। পুলিশের অবকাঠামোগত সংস্কার ও কার্যক্রমে পরিবর্তন এলেও মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সদস্যদের মনোবল নিয়ে বিভিন্ন সময় প্রশ্ন উঠেছে। এর মধ্যে পুলিশের ওপর হামলা, আসামি ছিনিয়ে নেওয়া এবং মব সৃষ্টির মতো ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে পুলিশের ওপর ২৭১টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে গত মে মাস পর্যন্ত পুলিশের ওপর ৮৭০টি হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে সংশ্লিষ্ট পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় পুলিশের স্বাভাবিক দায়িত্ব পালনের পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় পর্যায়ে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে পুলিশের কাজে হস্তক্ষেপ করলে তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে আরও জটিলতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে পুলিশের বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার অভিযোগ তোলার পাশাপাশি আইন প্রয়োগের সময় পরিচয় ব্যবহার করে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ উঠলে তা জনমনে দ্বৈত অবস্থানের প্রশ্ন তৈরি করে।
সচেতন মহলের মতে, পুলিশের কোনো সদস্য দায়িত্বে অবহেলা করলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করা যেতে পারে। একইভাবে কোনো পরিবহন চালক অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করলে কিংবা কেউ অবৈধ যানবাহন চালালে তার বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের পরিচয়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করা কিংবা সাধারণ মানুষকে হেনস্তা করার অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। অন্যথায় স্থানীয় পর্যায়ে আইন ও কর্তৃত্বের পরিবর্তে ব্যক্তির প্রভাব প্রতিষ্ঠার আশঙ্কা তৈরি হবে।
যা বলছে পুলিশ
সাতকানিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আব্দুল আলীমের কাছে পুলিশের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ এবং স্থানীয়ভাবে সমন্বয়ক পরিচয়ে প্রভাব বিস্তারের বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পুলিশ আগের চেয়ে অনেক বেশি কাজ করছে। কে কী বলছে, সেটা আমাদের দেখার বিষয় না।’
অন্যদিকে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রশক্তির সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব মো. সাঈদ হোসেন মানিকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সাতকানিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ জনপদে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসন ও পুলিশের নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন জরুরি। একই সঙ্গে রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক পরিচয় ব্যবহার করে কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা। তাদের মতে, অপরাধ বা অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তার বিচার হবে আইনের মাধ্যমে; কোনো ব্যক্তির পরিচয় বা প্রভাবের ভিত্তিতে নয়।











