পুলিশের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ, আবার পুলিশের কাছেই তদবির!
‘বাংলাদেশের ট্রাফিক সিস্টেম, নেতা আর ট্রাফিক পুলিশের চাঁদাবাজি’—এমন শিরোনামে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি ভিডিও পোস্ট করেন সাবেক এক এনসিপি নেতা। আর সেই ভিডিও নিজ ফেসবুক আইডিতে শেয়ার করেছেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রশক্তির সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব মো. সাঈদ হোসেন মানিক। ভিডিওতে ট্রাফিক পুলিশের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে ধরলেও বাস্তবে নিজেই ট্রাফিক পুলিশের কাছে মোটরসাইকেল ছাড়াতে তদবির করার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি সংশ্লিষ্ট চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকায় মামলা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলে তিনি সমন্বয়ক পরিচয় দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয় পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সন্ধ্যায় সাতকানিয়ার ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকা কেরানীহাটে অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান ও কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করছিল ট্রাফিক পুলিশ। এ সময় কয়েকটি মোটরসাইকেল আটক করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পরীক্ষা করা হচ্ছিল। খবর পেয়ে সেখানে যান ছাত্রশক্তি নেতা মো. সাঈদ হোসেন মানিক। অভিযোগ রয়েছে, তিনি একটি মোটরসাইকেল ছাড়িয়ে দিতে ট্রাফিক পুলিশের কাছে তদবির করেন।
তবে ট্রাফিক ইনচার্জ মো. মাহবুব তাকে জানান, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও বৈধ ডকুমেন্টস থাকলে মোটরসাইকেল ছেড়ে দেওয়া হবে। পরে সংশ্লিষ্ট চালক মোটরসাইকেলের কাগজপত্র নিয়ে এলেও তার কাছে ছিল না ড্রাইভিং লাইসেন্স। এ কারণে ট্রাফিক পুলিশ মামলা দেওয়ার উদ্যোগ নিলে সেখানে সমন্বয়ক পরিচয় দেন সাঈদ হোসেন মানিক। অভিযোগ রয়েছে, নিজের পরিচয় ও প্রভাব ব্যবহার করে শেষ পর্যন্ত মোটরসাইকেলটি ছাড়িয়ে নেন তিনি।
ঘটনাটি জানতে পেরে সেখানে উপস্থিত হন এ প্রতিবেদক। এ সময় কেরানীহাট পুলিশ বক্সের সামনে বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে সাঈদ হোসেন মানিক কোনো কথা বলেননি। তবে তার সঙ্গে থাকা কয়েকজন যুবক এ প্রতিবেদককে পুলিশের সঙ্গে কথা বলার অনুরোধ করেন।
পরে কেরানীহাট পুলিশ বক্সের ট্রাফিক ইনচার্জ মো. মাহবুবের কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বিব্রতবোধ করেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘আসলে কী আর বলব ভাই। সে সমন্বয়ক পরিচয় দিল, আমার তো কিছু করার নেই।’
লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানোর আইনি বিধান কী?
সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ অনুযায়ী, বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স বা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে শিক্ষানবিশ লাইসেন্স ছাড়া কোনো ব্যক্তি জনসাধারণের চলাচলের স্থানে মোটরযান চালাতে পারেন না। আইনের ৪ ধারায় এ বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। অন্যদিকে ৬৬ ধারায় এ বিধান লঙ্ঘনের অপরাধে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড অথবা ২৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
অর্থাৎ মোটরসাইকেলের নিবন্ধনসহ অন্যান্য কাগজপত্র ঠিক থাকলেও চালকের বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকলে সেটি আলাদা আইনগত অপরাধ। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট চালকের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কোনো রাজনৈতিক, সাংগঠনিক কিংবা সমন্বয়ক পরিচয় এ আইনি বাধ্যবাধকতা থেকে কাউকে অব্যাহতি দেয় না।
আইন অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ট্রাফিক পুলিশ কোনো ব্যক্তির পরিচয় বা প্রভাবের কারণে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে বাধ্য হলে তা সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। তবে ওই মোটরসাইকেল ছাড়ার ক্ষেত্রে কোনো লিখিত নির্দেশ বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছিল কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।
পুলিশের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ, আবার পুলিশের কাছেই তদবির!
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাফিক পুলিশের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগসংবলিত ভিডিও শেয়ার করার পর নিজের মোটরসাইকেল ছাড়ানোর তদবিরের অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে। পুলিশের বিরুদ্ধে অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে তা তথ্য-প্রমাণসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরা নাগরিকের অধিকার। কিন্তু একই সঙ্গে নিজের পরিচয় ব্যবহার করে আইন প্রয়োগে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠলে তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিদের মতে, ট্রাফিক পুলিশের বিরুদ্ধে ঘুষ বা চাঁদাবাজির অভিযোগ থাকলে তার তদন্ত হওয়া উচিত। একইভাবে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের পরিচয়ে কেউ অবৈধ যানবাহন ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ না হলে সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা কঠিন হয়ে পড়বে।
আগেও গণপরিবহনে মব সৃষ্টির অভিযোগ
সাঈদ হোসেন মানিকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে চট্টগ্রাম থেকে আগত মিনিবাস আটকে চালক ও সহকারীদের হেনস্তা করার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের কথিত অভিযোগ তুলে এসব যানবাহনে উঠে চালক ও সহকারীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করা হয়। কখনো জনসমাগম তৈরি করে তাদের ওপর চাপ প্রয়োগের অভিযোগও রয়েছে।
যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হলে সংশ্লিষ্ট পরিবহন কর্তৃপক্ষ, বিআরটিএ কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ জানানোর সুযোগ রয়েছে। কিন্তু ব্যক্তিগত উদ্যোগে গাড়ি আটকে কাউকে হেনস্তা করা কিংবা জনসমাগম তৈরি করে চাপ প্রয়োগ করা কোনোভাবেই আইনসম্মত প্রতিকার পদ্ধতি নয়।
এ ছাড়া বিভিন্ন সময় সাতকানিয়া থানার সামনে গিয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সম্প্রতি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে থানার সামনে ব্যানার নিয়ে দাঁড়িয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালন না করার অভিযোগ তুলতে দেখা যায় তাকে।
পুলিশের মনোবল ও আইন প্রয়োগের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন
গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। পুলিশের ওপর হামলা, আসামি ছিনিয়ে নেওয়া এবং বিভিন্ন স্থানে মব সৃষ্টির ঘটনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব পালনের পরিবেশকে কঠিন করে তুলেছে।
এমন পরিস্থিতিতে মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যরা যদি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর পরিচয় ও প্রভাবের কারণে আইন প্রয়োগে বাধার মুখে পড়েন, তাহলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনের সমান প্রয়োগ নিয়ে অনাস্থা তৈরি হতে পারে।
সচেতন মহলের মতে, পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তার তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পুলিশের কাজে অযাচিত হস্তক্ষেপ, ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তার কিংবা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের পরিচয় যেন আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা পাওয়ার হাতিয়ার না হয়, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।
সাতকানিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আব্দুল আলীমের কাছে পুলিশের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ এবং সমন্বয়ক পরিচয়ে প্রভাব বিস্তারের বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পুলিশ আগের চেয়ে অনেক বেশি কাজ করছে। কে কী বলছে, সেটা আমাদের দেখার বিষয় না।’
এদিকে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রশক্তির সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব মো. সাঈদ হোসেন মানিকের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।











