বান্দরবানে নাগরিক সংলাপ:পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি, নিরাপত্তা, বন্যা মোকাবিলা ও টেকসই সম্পদ ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান
আবুবকর ছিদ্দিক স্টাফ রিপোর্টারঃ
পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা, নিরাপত্তা জোরদার, বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে বান্দরবানে অনুষ্ঠিত এক নাগরিক সংলাপে।
বুধবার (২২ জুলাই) বান্দরবান হোটেল হিলভিউ কনভেনশন হলে অনুষ্ঠিত এ সংলাপের প্রতিপাদ্য ছিল “পার্বত্য চট্টগ্রাম: শান্তি, নিরাপত্তা, বন্যা মোকাবিলা ও প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা”।
এসময় উপস্থিত বক্তব্য রাখেন,কাজী মুজিবুর রহমান,চেয়ারম্যান কেন্দ্রীয় নাগরিক পরিষদ,অধ্যাপক ওসমান গনি সিনিয়র যুগ্ন আহবায়ক বান্দরবান জেলা বিএনপি, মুজিবুর রশিদ,যুগ্ন আহবায়ক বান্দরবান জেলা বিএনপি,আব্দুস সালাম আজাদ, আমির বাংলাদেশ জামায়েত ইসলাম বান্দরবান শাখা,আবুল কালাম আজাদ সভাপতি ইসলামী আন্দোলন বান্দরবান শাখা,এডভোকেট আবু জাফর সাধারণ সম্পাদক জেলা আইনজীবী সমিতি,আসিফ ইকবাল, সভাপতি পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র পরিষদ বান্দরবান শাখা, খোয়াই চিং মং চাক,সভাপতি সিএসটি সম্প্রীতি জোট আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন সাংবাদিক শাহরিয়ার হাসান দৈনিক দেশ বর্তমান পত্রিকার হেড অফ নিউজ সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, সচেতন নাগরিক এবং গণমাধ্যমকর্মীরা অংশ নেন।
কাজী মুজিবুর রহমান বলেন,পার্বত্য অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য আয়কর অব্যাহতির প্রস্তাবকে স্বাগত জানালেও, একই অঞ্চলে বসবাসরত বাঙালিদের এ সুবিধার বাইরে রাখায় বৈষম্য তৈরি হয়েছে।বাজারফান্ড প্লটের লীজের মেয়াদ-৯৯ বছরে উন্নীত করা ও বন্ধ রাখা ব্যাংক ঋণ পূর্বের ন্যায় চালু করা, জমি ক্রয়-বিক্রয় বা নামজারির ক্ষেত্রে তিন দফা এলআর ফান্ড বন্ধ করে ৬১ জেলার ন্যায় ভূমি ব্যবস্থাপনা ও রেজিষ্ট্রেশন ব্যবস্থা চালু করা, জমি ক্রয়-বিক্রয়-ব্যবসা-চাকুরী-শিক্ষা সহ সর্বক্ষেত্রে রাজার সনদ বাতিল করা, হেডম্যান কার্যালয়ের পরিবর্তে সকল উপজেলা ভূমি অফিসে ভূমির কর/খাজনা পরিশোধের অবাধ সুযোগ সৃষ্টি করা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষা, আইনশৃঙ্খলা ও জনগণের জানমালের নিরাপত্তার স্বার্থে প্রত্যাহারকৃত ব্রিগেড ও ২৪৬টি সেনাক্যাম্প পুনঃস্থাপনের দাবী জানান।
অন্যান্য বক্তা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় এক-দশমাংশ হলেও এর ভূ-রাজনৈতিক, পরিবেশগত, অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তাগত গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। দীর্ঘদিনের সংঘাত, ভূমি বিরোধ, উন্নয়ন বৈষম্য, নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট বন্যা, পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধস এ অঞ্চলের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। তাই শান্তি, নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করার আহ্বান জানান তারা।
আলোচনায় সংঘাতের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি, চাঁদাবাজি, অপহরণ, অবৈধ অস্ত্র, সীমান্তপথে অপরাধ, বনজ সম্পদ পাচার ও মাদক চোরাচালানের মতো বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গোয়েন্দা সক্ষমতা বৃদ্ধি, কমিউনিটি পুলিশিং, সীমান্ত নজরদারি জোরদার এবং স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বন্যা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে আলোচনায় বলা হয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অতিবৃষ্টি, পাহাড় ধস, নদীর নাব্যতা হ্রাস, কৃষি ক্ষতি, সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং বিশুদ্ধ পানির সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, আশ্রয়কেন্দ্র বৃদ্ধি, নদী পুনঃখনন, পাহাড় কাটা বন্ধ, জলাধার সংরক্ষণ এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণের সুপারিশ করা হয়।
এছাড়া বনভূমি, পাহাড়, নদী, জীববৈচিত্র্য ও পর্যটন সম্পদের সুরক্ষায় সামাজিক বনায়ন সম্প্রসারণ, বন সংরক্ষণ আইন বাস্তবায়ন, পরিবেশ আদালত শক্তিশালীকরণ, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটন উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
বক্তারা আরও বলেন, অংশগ্রহণমূলক প্রশাসন, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নারীর ক্ষমতায়ন, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব।
অনুষ্ঠানের শেষে বক্তারা স্থায়ী শান্তির জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপ, আইনের শাসন সুদৃঢ় করা, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ, যুবসমাজের কর্মসংস্থান এবং গবেষণাভিত্তিক নীতি প্রণয়নের আহ্বান জানান।
সমাপনী বক্তব্যে আয়োজকরা আশা প্রকাশ করেন, রাষ্ট্র, স্থানীয় জনগণ, জনপ্রতিনিধি, গবেষক, নাগরিক সমাজ ও উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব ও সমৃদ্ধ পার্বত্য চট্টগ্রাম গড়ে তোলা সম্ভব হবে।







