বন্যা, দুর্যোগে ছুটে চলা মানবিক মানুষ নুরুল আমিন চৌধুরী
আলমগীর আলম
মানুষ মানুষের জন্য। জীবন জীবনের জন্য। এই কথাগুলো আমরা প্রায়ই শুনি, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বলি, আবার অনেক সময় গান হিসেবেও গেয়ে থাকি। কিন্তু খুব কম মানুষই আছেন, যারা এই কথাগুলোকে নিজের জীবনের আদর্শে পরিণত করেন। যারা মানুষের দুঃখকে নিজের দুঃখ মনে করেন, অন্যের কান্নাকে নিজের হৃদয়ের ব্যথা হিসেবে অনুভব করেন এবং কোনো প্রতিদান কিংবা প্রচারের আশা না করে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান। তেমনই একজন মানবিক মানুষ, সমাজসেবক ও বিশিষ্ট সংগঠক নুরুল আমিন চৌধুরী আরমান।
সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যা ও জলাবদ্ধতায় যখন বান্দরবানের বিস্তীর্ণ জনপদ পানির নিচে তলিয়ে গেছে, হাজারো পরিবার ঘরবন্দি, অসংখ্য শিশু, নারী ও বৃদ্ধ খাদ্যসংকটে দিন পার করছেন, তখন আরমান নিজের ব্যক্তিগত ব্যস্ততা ভুলে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কারো ঘরে খাবার নেই, কোথাও শিশুর কান্না, কোথাও বৃদ্ধ বাবা-মায়ের অসহায় অপেক্ষা, আবার কোথাও অসুস্থ মানুষ চিকিৎসাহীন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। এসব দৃশ্য তাকে ঘরে বসে থাকতে দেয়নি।
lallala lottee স্বেচ্ছাসেবীদের নিয়ে তিনি প্রতিদিন রান্না করা খাবার, শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও জরুরি প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে দুর্গম পাহাড়ি গ্রাম থেকে গ্রামে ছুটে ছুটে। চলেছেন। কখনো নৌকায়, কখনো কাদামাটি ভেঙে, কখনো কোমরসমান পানি পেরিয়ে তিনি পৌঁছে ছুটে চলেছেন যাচ্ছেন সেইসব মানুষের কাছে, যাদের কাছে সহায়তা পৌঁছানো সবচেয়ে কঠিন। তার কাছে মানবসেবা কোনো অনুষ্ঠান নয়, এটি জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য দায়িত্ব। নুরুল আমিন চৌধুরী আরমানের এই মানবিক পথচলার শুরু আজকের নয়। শৈশব থেকেই তিনি তার পিতার হাত ধরে সমাজসেবা ও মানবিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হন। ছোটবেলা থেকেই তিনি শিখেছেন, মানুষের পাশে দাঁড়ানোই সবচেয়ে বড় ইবাদত, সবচেয়ে বড় মানবিকতা। সেই শিক্ষা আজও তিনি হৃদয়ে ধারণ করে চলেছেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি নীরবে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে রয়েছেন। অসচ্ছল
পরিবারের আর্থিক সহায়তা, অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা ব্যয়ে সহযোগিতা, এতিম ও দরিদ্র পরিবারের খাদ্য সহায়তা, শীতার্ত মানুষের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ, ঈদে নতুন পোশাক ও খাদ্যসামগ্রী প্রদান, অগ্নিকাণ্ড কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সহায়তা, এতিমখানা ও ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনুদান প্রদানসহ অসংখ্য মানবিক কর্মকাণ্ডে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে আসছেন।
বিশেষ করে শিক্ষা খাতে তার অবদান অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তিনি বিশ্বাস করেন, একটি শিক্ষিত প্রজন্মই পারে সমাজকে আলোকিত করতে। তাই প্রতিবছর ব্যক্তিগত উদ্যোগে মেধাবী অথচ অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপকরণ, বই, খাতা, কলম, স্কুলব্যাগ, স্কুল ড্রেস, টিফিন এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা প্রদান করে আসছেন। অনেক শিক্ষার্থীর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলে তিনি নীরবে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। অসংখ্য শিক্ষার্থী আজও তার সহযোগিতার কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন।
শুধু অর্থ দিয়ে নয়, সময় দিয়ে, শ্রম দিয়ে এবং ভালোবাসা দিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই তার সবচেয়ে বড় পরিচয়। তিনি মনে করেন, একজন ক্ষুধার্ত মানুষের হাতে একবেলা খাবার তুলে দেওয়া যেমন মানবিক দায়িত্ব, তেমনি একজন হতাশ মানুষের কাঁধে হাত রেখে সাহস জোগানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান বন্যা পরিস্থিতিতে তার পরিচালিত ত্রাণ কার্যক্রম স্থানীয় মানুষের মধ্যে নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে। যেসব পরিবার দিনের পর দিন রান্না করতে পারেনি, তাদের হাতে রান্না করা খাবার পৌঁছে দিয়েছেন তিনি। শিশুদের জন্য আলাদা খাবারের ব্যবস্থা করেছেন। বৃদ্ধ ও অসুস্থদের খোঁজ নিয়েছেন। দুর্গম এলাকায় গিয়ে মানুষের প্রয়োজন শুনে তা পূরণের চেষ্টা করেছেন। তার এই নিরলস প্রচেষ্টা প্রমাণ করে, মানবিকতা কেবল কথায় নয়, বাস্তব কর্মেই প্রকাশ পায়।
স্থানীয়দের ভাষায়, দুর্যোগে অনেকেই ছবি তুলতে আসেন, কিন্তু নুরুল আমিন চৌধুরী আরমান মানুষের পাশে দাঁড়াতে আসেন। মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই যেন তার সবচেয়ে বড় আনন্দ। তাই তিনি প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকেও মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন।
নুরুল আমিন চৌধুরী আরমান বলেন, “মানুষের কষ্ট দেখে চুপ করে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। মানবিকতা না থাকলে মানুষ হিসেবে নিজেকে অপরাধী মনে হয়। আল্লাহ আমাকে বামাকে যতটুকু সামর্থ্য সামর্থ্য দিয়েছেন, দিয়েছেন, তা মানুষের কল্যাণে ব্যয় করার চেষ্টা করি। একজন ক্ষুধার্ত মানুষ যখন খাবার পেয়ে হাসিমুখে দোয়া করেন, সেটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। মানুষের দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার মধ্যেই জীবনের প্রকৃত অর্থ খুঁজে পাই। “তিনি আরও বলেন, ‘দুর্যোগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো কোনো অনুগ্রহ নয়, এটি আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। সমাজের প্রত্যেক সামর্থ্যবান মানুষ যদি অন্তত একটি পরিবারের দায়িত্ব নেন, তাহলে কোনো মানুষ না খেয়ে থাকবে না। মানবিক সমাজ গড়তে হলে আমাদের সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে।’ আজকের এই স্বার্থকেন্দ্রিক সময়ে নুরুল আমিন চৌধুরী আরমানের মতো মানুষ সমাজকে নতুন করে আশাবাদী করে তোলে। তিনি প্রমাণ করেছেন, সম্পদের চেয়ে বড় হলো মানবিকতা, পদ-পদবির চেয়ে বড় হলো মানুষের ভালোবাসা এবং জনপ্রিয়তার চেয়ে বড় হলো মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর আনন্দ।
মানুষের কল্যাণে তার এই নিরলস পথচলা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকুক, মানবতার আলোয় আলোকিত হোক আরও অসংখ্য জীবন, এমন প্রত্যাশাই বান্দরবাসীসহ সকলের।







