থানার তোলা ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ালো কীভাবে?
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে যুবলীগ নেতা নুরুল আলমের মৃত্যু ঘিরে যখন পরিবার, স্বজন ও স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, তখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে গ্রেফতারের পর থানায় তোলা একটি ছবি। পুলিশের হেফাজতে থাকা অবস্থায় তোলা ওই ছবিটি কীভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ল, তা নিয়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা।
নুরুল আলম চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার ঢেমশা ইউনিয়নের বাসিন্দা এবং স্থানীয় যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি দল তাকে আটক করে। পরে তাকে সাতকানিয়া থানায় হস্তান্তর করা হয়। আদালতের মাধ্যমে ওইদিন সন্ধ্যায় তাকে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়।
কারা কর্তৃপক্ষের দাবি, বুধবার সকালে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন নুরুল আলম। শ্বাসকষ্ট ও বুকে ব্যথার অভিযোগ করলে তাকে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। কারা কর্তৃপক্ষ প্রাথমিকভাবে তার মৃত্যুর কারণ হিসেবে ‘ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক’-এর কথা জানিয়েছে।
তবে পরিবারের সদস্যরা এই ব্যাখ্যা মানতে নারাজ। তাদের দাবি, নুরুল আলম সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় আটক হয়েছিলেন। গ্রেফতারের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কারাগারে গিয়ে পরদিন সকালে তার মৃত্যু হওয়ায় ঘটনাটি সন্দেহজনক। তারা মৃত্যুর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন।
এমন পরিস্থিতিতে নুরুল আলমের আটকের পর থানায় তোলা একটি ছবি নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ছবিতে দেখা যায়, সাতকানিয়া থানার এক পুলিশ সদস্যের পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছেন নুরুল আলম। জানা গেছে, ডিবি পুলিশ তাকে আটকের পর থানায় হস্তান্তর করলে পুলিশের ব্যবস্থাপনায় এই ছবি তোলা হয়।
স্থানীয় সাংবাদিকদের অভিযোগ, নুরুল আলমের গ্রেফতারের বিষয়ে থানার পক্ষ থেকে কোনো প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়নি। এমনকি ছবিটিও গণমাধ্যমকর্মীদের সরবরাহ করা হয়নি। অথচ ছবি তোলার কিছু সময়ের মধ্যেই সেটি বিভিন্ন ফেসবুক আইডি, গ্রুপ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
সাংবাদিকদের প্রশ্ন, থানার অভ্যন্তরে তোলা একটি ছবি সাংবাদিকদের কাছে না পৌঁছালেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কীভাবে ছড়িয়ে গেল? কে বা কারা ছবিটি প্রথম প্রকাশ করেছে? ছবিটি বাইরে যাওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশের কোনো সদস্য কিংবা সংশ্লিষ্ট অন্য কোনো পক্ষ জড়িত ছিল কি না, সেটিও এখন আলোচনায় এসেছে।
নুরুল আলমের পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, মৃত্যুর ঘটনাকে ঘিরে যখন তারা ডিবি পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, তখন থানার তোলা ছবি ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা উচিত।
পরিবারের এক সদস্য বলেন, আমরা জানতে চাই, থানায় তোলা ছবি কারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে। একজন মানুষকে আটকের পর তার ছবি দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়া হলো, পরে আবার তিনি কারাগারে মারা গেলেন। পুরো বিষয়টি তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয় সচেতন মহলও মনে করছে, পুলিশের হেফাজতে থাকা কোনো ব্যক্তির ছবি যদি আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়াই বাইরে চলে যায়, তাহলে সেটি প্রশাসনিক গোপনীয়তা ও পেশাগত দায়িত্বশীলতার প্রশ্ন তোলে। বিশেষ করে যখন ওই ব্যক্তির মৃত্যু নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তখন ছবিটি ফাঁস হওয়ার উৎস খুঁজে বের করাও জরুরি।
নুরুল আলমের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্তের অপেক্ষায় রয়েছে পরিবার। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিটির উৎস শনাক্ত করার দাবিও জোরালো হচ্ছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, থানার ক্যামেরায় তোলা ছবিটি যদি সাংবাদিকদের না দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে সেটি কার মাধ্যমে বাইরে গেল? আর এই ছবি প্রচারের পেছনে কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল কি না, সেটিও এখন খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
সাতকানিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, নুরুল আলমকে ডিবি পুলিশ আটকের পর থানায় হস্তান্তর করেছিল। থানায় প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া শেষে তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে ছবিটি ছড়িয়ে পড়েছে, সেটি কীভাবে বাইরে গেছে সে বিষয়ে আমার জানা নেই। বিষয়টি খতিয়ে দেখা যেতে পারে।
থানার পক্ষ থেকে কোনো সাংবাদিক বা গণমাধ্যমকে ছবিটি সরবরাহ করা হয়নি বলে স্বীকার করেন ওসি।











