ফুল নেওয়া থামছে না ইউএনওর, এক সপ্তাহেও মাঠে প্রশাসনিক তৎপরতার দেখা নেই
চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার এক সপ্তাহ পার হয়েছে ৩৬তম বিসিএসের কর্মকর্তা রাজীব দাশ পুরকায়স্থের। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের পর সাত দিনেও থামেনি ফুলেল শুভেচ্ছা। প্রতিদিনই উপজেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি, রাজনৈতিক নেতা, সামাজিক সংগঠন ও পেশাজীবী প্রতিনিধিদের ফুল নিয়ে আসা, সৌজন্য সাক্ষাৎ এবং ছবি তোলার ব্যস্ততা চলছে।
অন্যদিকে, নতুন ইউএনও দায়িত্ব নেওয়ার পর এক সপ্তাহে মাঠ প্রশাসনে তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। বাজার তদারকি, মোবাইল কোর্ট, ফুটপাত দখল, যানজট, অতিরিক্ত মূল্য আদায় কিংবা রাত ৮টার পর দোকানপাট বন্ধ রাখার সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নে নতুন ইউএনওর নেতৃত্বে কোনো অভিযান বা দৃশ্যমান কার্যক্রম দেখা যায়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
গত সোমবার বিকেলে সাতকানিয়ার ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব নেন রাজীব দাশ পুরকায়স্থ। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তার কার্যালয়ে শুরু হয় ফুলেল শুভেচ্ছার পর্ব। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তি ও সংগঠনের পক্ষ থেকে ফুল নিয়ে তাকে স্বাগত জানানো হচ্ছে।
কেউ এককভাবে, কেউ আবার দলবদ্ধ হয়ে ইউএনওর সঙ্গে সাক্ষাৎ করছেন। ফুল দেওয়ার পর অনেকেই ছবি তুলছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এসব ছবি ছড়িয়ে পড়ছে।
দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম দু-এক দিন এমন সৌজন্য সাক্ষাৎকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখলেও এক সপ্তাহ পরও একই চিত্র অব্যাহত থাকায় বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন—একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে ফুলেল শুভেচ্ছা গ্রহণের চেয়ে উপজেলার দীর্ঘদিনের সমস্যা চিহ্নিত করে মাঠ প্রশাসনকে সক্রিয় করা কি বেশি জরুরি নয়?
সাংবাদিক নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘শুনলাম ইউএনও অফিসে নাকি প্রচুর ভিড় থাকে, ফুলের শুভেচ্ছা নিতে নিতে ইউএনও হয়রান।’
নুরুল ইসলাম বলেন, ‘সরকারের এমন একটা প্রজ্ঞাপন দেওয়া উচিত—কোনো সরকারি কর্মকর্তাকে ফুল দেওয়া যাবে না। তাহলে সব তেলবাজি বন্ধ হবে।’
স্থানীয় বাসিন্দা রাশেদ বলেন, প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষ থেকে নতুন ইউএনওকে শুভেচ্ছা জানানো স্বাভাবিক। তবে বাইরের ব্যক্তিদের একের পর এক ফুল নিয়ে আসার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তার ভাষায়, ‘উনি জনগণের সেবা করার জন্য আসছেন। আমার মনে হয় উনি ফুল নিতে নিতে আবার বিদায়ের সময় হয়ে যাবে।’
দক্ষিণ চট্টগ্রামের অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকা সাতকানিয়ার কেরানীহাট। দীর্ঘদিন ধরে এই বাজারে যানজট, ফুটপাত দখল ও বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগ রয়েছে।
সড়কের পাশে অবৈধভাবে দোকান ও বিভিন্ন স্থাপনা বসানো, ফুটপাত দখল এবং সড়কের ওপর পণ্য ওঠানামার কারণে পথচারী ও যানবাহন চলাচলে ভোগান্তির অভিযোগও রয়েছে।
এসব সমস্যা সমাধানে উপজেলা প্রশাসনের নিয়মিত বাজার তদারকি ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা প্রত্যাশা করেন স্থানীয়রা।
কিন্তু নতুন ইউএনও দায়িত্ব নেওয়ার এক সপ্তাহেও এসব বিষয়ে মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান কোনো ধরনের প্রশাসনিক অভিযান দেখা যায়নি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
উপজেলা প্রশাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যমান কার্যক্রম হলো মোবাইল কোর্ট। ভেজালবিরোধী অভিযান, অতিরিক্ত মূল্য আদায়, অবৈধ স্থাপনা, পরিবেশ দূষণ, খাদ্যপণ্যে অনিয়মসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে প্রশাসন।
সাতকানিয়ার বিভিন্ন বাজারে এসব অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ফলে নতুন ইউএনও দায়িত্ব নেওয়ার পর স্থানীয়দের প্রত্যাশা ছিল দ্রুত বাজার পরিদর্শন ও নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার।
কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের এক সপ্তাহেও এ ধরনের দৃশ্যমান তৎপরতা চোখে না পড়ায় প্রশ্ন উঠেছে—নতুন ইউএনওর মাঠ প্রশাসনের ‘অ্যাকশন’ শুরু হবে কবে?
অন্যদিকে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে নির্দিষ্ট সময়ের পর মার্কেট ও দোকানপাট বন্ধ রাখার সরকারি নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু সাতকানিয়ার বিভিন্ন এলাকায় রাত ৮টার পরও দোকানপাট খোলা থাকার অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, শুধু নির্দেশনা জারি করলেই তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত হয় না; প্রয়োজন নিয়মিত তদারকি ও প্রয়োজনে আইনগত ব্যবস্থা।
নতুন ইউএনও দায়িত্ব নেওয়ার পর এ নির্দেশনা বাস্তবায়নে প্রশাসনের তৎপরতা নেই বলে জানান স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের অনেকেই বলছেন, নতুন ইউএনওকে স্বাগত জানানো অবশ্যই সৌজন্যের বিষয়। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের এক সপ্তাহ পর জনগণের প্রত্যাশা বদলে যায়। তাদের ভাষায়, এখন আর ফুলের তোড়া নয়, তারা দেখতে চান প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের কাজ।
বাজারে অনিয়ম বন্ধ, যানজট নিরসন, ফুটপাত দখলমুক্ত করা, নিত্যপণ্যের বাজার তদারকি, অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নে প্রশাসনের সক্রিয়তা চান তারা।
সাতকানিয়ার বাসিন্দাদের একাংশের প্রশ্ন, নতুন ইউএনওর কার্যালয়ে ফুলেল শুভেচ্ছা গ্রহণের এই ধারাবাহিকতা আর কতদিন চলবে? প্রশাসনিক দায়িত্বের ব্যস্ততার মধ্যে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও ফুল গ্রহণের জন্য কতটা সময় ব্যয় হচ্ছে, আর জনগণের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো দেখতে মাঠে কতটা সময় দেওয়া হচ্ছে—সেটিও এখন আলোচনার বিষয়।
তাদের প্রত্যাশা, শুভেচ্ছা ও ফুলেল আয়োজনের আনুষ্ঠানিকতা দ্রুত শেষ করে নতুন ইউএনও মাঠ প্রশাসনে সক্রিয় হবেন। বিশেষ করে কেরানীহাটসহ উপজেলার ব্যস্ত বাজারগুলোতে নিয়মিত তদারকি, মোবাইল কোর্ট, যানজট নিরসন, ফুটপাত দখলমুক্ত করা এবং রাত ৮টার পর দোকানপাট বন্ধের সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে জানতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাজীব দাশ পুরকায়স্থের সরকারি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।
ফলে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের দৃশ্যমান কার্যক্রম না থাকার অভিযোগ এবং ফুলেল শুভেচ্ছা গ্রহণের ধারাবাহিকতা নিয়ে ইউএনওর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।











