কানে কম শোনেন ওসি, ভোগান্তিতে সেবাপ্রার্থীরা
একটি নারী সংক্রান্ত অভিযোগ জানাতে সাতকানিয়া থানায় গিয়েছিলেন স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধি। তাঁর ভাষ্য, যে বিষয়টি এক মিনিটেই বলা সম্ভব, সেটি বোঝাতে তাঁকে প্রায় ১৫ মিনিট সময় ব্যয় করতে হয়েছে। একই কথা কয়েকবার পুনরাবৃত্তি করার পরও কাঙ্ক্ষিত সাড়া পাননি। একপর্যায়ে পাশের এক পুলিশ কর্মকর্তাকে বিষয়টি বোঝাতে চাইলে ওসি তাঁকে থামিয়ে দিয়ে নিজেকেই বলতে বলেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই জনপ্রতিনিধি বলেন, ১৭টি ইউনিয়নের মানুষের নিরাপত্তা ও সেবার দায়িত্বে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ থানার প্রধান কর্মকর্তা যদি এভাবে মানুষের কথা শুনতে না পারেন, তাহলে সাধারণ মানুষ কীভাবে সেবা পাবে?
এমন অভিযোগ শুধু একজনের নয়। সাতকানিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমকে ঘিরে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ সেবাপ্রার্থীদের মধ্যে নানা ধরনের অভিযোগ জমা হচ্ছে। তাঁদের দাবি, ওসির শ্রবণ সমস্যা ও আচরণগত কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে থানায় গিয়ে কাঙ্ক্ষিত সেবা পেতে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন অনেকেই।
স্থানীয় এক রাজনৈতিক দলের নেতা অভিযোগ করে বলেন, ওসিকে কোনো বিষয় জানাতে গেলে অনেক সময় তিনি স্পষ্টভাবে শুনতে পান না। একই কথা বারবার বলতে হয়। আবার পুনরায় বললে তিনি বিরক্তি প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, কখনো কখনো মানুষের সঙ্গে কথাবার্তার ধরনও অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। জনসেবামূলক একটি পদে থেকে মানুষের সঙ্গে আরও ধৈর্যশীল আচরণ প্রত্যাশিত।
আরেক ভুক্তভোগীর অভিযোগ, একদিন যে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে, পরদিন একই বিষয়ে গেলে মনে হয় তিনি আগের কথাগুলো মনে করতে পারছেন না।
ওই ব্যক্তি বলেন, রাতে ফোনে পুরো ঘটনা শুনে থানায় সাধারণ ডায়েরি করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। পরদিন থানায় গিয়ে একই কথা বললে তিনি বলেন, এটা নিজেরাই সমাধান করতে পারেন। এমন দ্বৈত অবস্থানে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, থানার প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগে এলাকায় অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে। প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া, জায়গা-জমি নিয়ে সংঘর্ষ, ডাকাতির চেষ্টা ও অপহরণের মতো একাধিক ঘটনায় দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
এছাড়া গত ৩০ মে গভীর রাতে কেরানীহাট এলাকায় পুলিশের একটি চেকপোস্টকে ঘিরেও প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী। তাঁদের দাবি, ওইদিন রাত ১২টার পর কেরানীহাট বাজার এলাকায় অস্থায়ী চেকপোস্ট বসিয়ে ঢাকা থেকে আসা একের পর এক বাস থামানো হয়। অভিযোগ রয়েছে, ওসির পছন্দমতো আসন না পাওয়ায় বিভিন্ন বাসে তল্লাশির নামে দীর্ঘ সময় ধরে যানবাহন আটকে রাখা হয়।
ফলে রাত ১টার দিকে কেরানীহাট বাজার এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয় এবং যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পরে একটি বাসে পছন্দসই আসন পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে রওনা হন বলে দাবি করেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।
দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন যানবাহন আটকে রাখায় ওই এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয় এবং যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়েন। তবে এ বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ৩১ মে কাঞ্চনা ইউনিয়নের ফুলতলা এলাকায় জায়গা-সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন ও গুলির ঘটনা ঘটে। এছাড়া ৪ জুন পূর্ব ছদাহা এলাকায় একটি গরুর খামারে ডাকাতির চেষ্টার অভিযোগ ওঠে। একই দিনে এক কিশোর অপহরণের অভিযোগও সামনে আসে। এসব ঘটনায় দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সাতকানিয়ার মতো জনবহুল একটি উপজেলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মূল দায়িত্ব থানার ওপর। কিন্তু সেবাপ্রার্থীদের একাংশ যদি থানায় গিয়ে নিজেদের কথা ঠিকভাবে উপস্থাপন করতেই হিমশিম খান, আর গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ নিষ্পত্তিতে ধীরগতি থাকে, তাহলে জনমনে আস্থার সংকট তৈরি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং থানার সেবার মান আরও কার্যকর ও জনবান্ধব করতে হবে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে সাতকানিয়া থানার ওসি মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, শারীরিক সমস্যা থাকতেই পারে। তবে জনগণকে যথাযথ সেবা দিতে হবে। যদি কোনো সেবাপ্রার্থী সমস্যার সমাধান না পেয়ে ফিরে যান, তাহলে সেটি অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে।











