‘আইনজীবী নন’ বলে শুনানিতে বাধা, ইউএনও’র কাছে অভিযোগ
চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) সামছুজ্জামানের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আচরণ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে বক্তব্য উপস্থাপনে বাধা দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি স্থানীয় সচেতন মহলে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নিকট লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন রিদুয়ানুল হক নামের এক আইন শিক্ষার্থী।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, সাতকানিয়া সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ের রেভিনিউ কোর্টে চলমান বিভিন্ন মিচ (বিবিধ) মামলায় দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূল পর্যায়ের সাধারণ মানুষ নিজেদের বক্তব্য উপস্থাপনের জন্য প্রতিনিধি নিয়োগ করে আসছেন। এসব প্রতিনিধিদের মধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পাস ব্যক্তি, আইন শিক্ষার্থী, দলিল লেখক, স্বশিক্ষিত ব্যক্তি এবং কখনো কখনো আইনজীবীরাও অংশগ্রহণ করেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রতিনিধিত্বের জন্য কোনো নির্ধারিত ফরম কিংবা লিখিত নীতিমালা প্রচলিত নেই। ফলে দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় বাস্তবতায় সাধারণ জনগণ তাদের আস্থাভাজন ব্যক্তিদের মাধ্যমে শুনানিতে বক্তব্য উপস্থাপন করে আসছেন।
লিখিত অভিযোগে রিদুয়ানুল হক উল্লেখ করেন, গত ৪ মে মিচ মামলা নং-২২/২০২৪ এর শুনানিকালে তিনি প্রতিপক্ষের পক্ষে বক্তব্য উপস্থাপন করতে গেলে সহকারী কমিশনার (ভূমি) হঠাৎ তাকে থামিয়ে দেন। এ সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নাকি প্রকাশ্যে বলেন, তিনি রিদুয়ানুল হককে চেনেন না এবং আগে কখনো ভূমি অফিসে দেখেননি, তাই তিনি কোনো পক্ষের হয়ে বক্তব্য উপস্থাপন করতে পারবেন না।
অভিযোগকারী দাবি করেন, তিনি এর আগেও একই রেভিনিউ কোর্টে বিভিন্ন মামলায় গ্রামীণ জনগণের পক্ষে তথ্য-উপাত্ত, যুক্তি ও দলিলাদি উপস্থাপন করেছেন। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের অশিক্ষিত ও দরিদ্র মানুষদের আইনগত বিষয়ে সহায়তা দিয়ে আসছেন দীর্ঘদিন ধরে।
তিনি বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ঢাকা সিটি ‘ল’ কলেজে এলএলবি প্রথম বর্ষে অধ্যয়নরত এবং সাতকানিয়া-লোহাগাড়া চৌকি আদালতে এডভোকেট ক্লার্ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, গত ২০ এপ্রিল মিচ মামলা নং-১২৮/২০২৫ এর শুনানিকালে তাকে কোনো ধরনের বাধা দেওয়া হয়নি। কিন্তু মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ৪ মে’র শুনানিতে তাকে ‘অগ্রহণযোগ্য ব্যক্তি’, ‘আইনজীবী নন’ এবং ‘কখনো ভূমি অফিসে দেখা যায়নি’—এমন মন্তব্য করে অপমান করা হয়। শুধু তাই নয়, তাকে কোনো ধরনের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ না দিয়েই শুনানির কার্যক্রম থেকে কার্যত সরিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
রিদুয়ানুল হক তার আবেদনে উল্লেখ করেন, একই আদালতে বহু ব্যক্তি রয়েছেন যারা আইনজীবী বা আইন শিক্ষার্থী নন, এমনকি কোনো আনুষ্ঠানিক আইনি জ্ঞানও নেই; তবুও তারা নিয়মিতভাবে শুনানিতে অংশগ্রহণ করে বক্তব্য উপস্থাপন করছেন। অথচ তাকে আলাদাভাবে টার্গেট করে বাধা দেওয়া হয়েছে, যা তার মতে স্পষ্ট বৈষম্যমূলক আচরণ।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, সহকারী কমিশনার (ভূমি) তাকে মৌখিকভাবে এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ভবিষ্যতেও তিনি আর কোনো শুনানিতে অংশ নিতে পারবেন না। এতে তিনি মানসিকভাবে ভীষণভাবে মর্মাহত ও অপমানিত বোধ করেছেন বলে লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেন।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় আইন অঙ্গনেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। একাধিক সচেতন ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রেভিনিউ কোর্টে প্রতিনিধিত্বের বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা না থাকায় মাঠপর্যায়ে অনেক সময় ব্যক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত তৈরি হয়। এতে সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার প্রাপ্তি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সাতকানিয়াসহ বিভিন্ন উপজেলায় ভূমি সংক্রান্ত শুনানিতে সাধারণ মানুষ প্রায়ই আইনজীবী নিয়োগের আর্থিক সক্ষমতা না থাকায় পরিচিত প্রতিনিধি বা আইন শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে বক্তব্য উপস্থাপন করিয়ে থাকেন। বিশেষ করে দরিদ্র ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য এ ধরনের প্রতিনিধিরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
রিদুয়ানুল হক তার অভিযোগে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে বিষয়টি সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি জানতে চেয়েছেন—কোন কোন যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তি রেভিনিউ কোর্টে শুনানিতে অংশগ্রহণ করতে পারবেন, সে বিষয়ে লিখিত নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে কি না। এছাড়া শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট শুনানিতে তাকে অপমান ও ভবিষ্যতে অংশগ্রহণে নিরুৎসাহিত করার অভিযোগেরও প্রশাসনিক তদন্ত দাবি করেন তিনি।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে সাতকানিয়ার সহকারী কমিশনার (ভূমি) সামছুজ্জামান বলেন, কাউকে অপমান বা হেয় করার কোনো ঘটনা ঘটেনি। আদালতের কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে নিয়ম-শৃঙ্খলা বজায় রেখে শুনানি পরিচালনা করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে যে অভিযোগ করা হয়েছে, তা সঠিক নয়।
অন্যদিকে, লিখিত অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান।











