সাতকানিয়ায় শিক্ষা অফিসের ছত্রচ্ছায়ায় এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের সাংবাদিকতা
সরকারের সদ্য জারি করা এমপিও নীতিমালায় স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলায় এমপিওভুক্ত একাধিক শিক্ষক নিয়মিতভাবে সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত রয়েছেন। বিষয়টি উপজেলা শিক্ষা অফিসের অজানা নয়—বরং অভিযোগ রয়েছে, দপ্তরের নীরব সম্মতি ও প্রশাসনিক প্রশ্রয়েই দীর্ঘদিন ধরে নীতিমালা লঙ্ঘন অব্যাহত রয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ প্রণীত ‘বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (স্কুল ও কলেজ)–এর জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা–২০২৫’–এ বলা হয়েছে, এমপিওভুক্ত কোনো শিক্ষক বা কর্মচারী একই সঙ্গে একাধিক চাকরি কিংবা কোনো আর্থিক লাভজনক পেশায় যুক্ত থাকতে পারবেন না। নীতিমালার সংশ্লিষ্ট ধারায় সাংবাদিকতা ও আইন পেশাকে সরাসরি আর্থিক লাভজনক পেশা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, এ নির্দেশনা অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের এমপিও বাতিলসহ বিভাগীয় ও প্রশাসনিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে।
তবে নীতিমালা জারির পরও সাতকানিয়া উপজেলায় এর বাস্তব প্রয়োগে কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। এমনকি প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ বা তালিকা প্রণয়নের কাজও শুরু হয়নি।
স্থানীয় সূত্র ও শিক্ষক সমাজের একাধিক সদস্য জানান, উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত একাধিক এমপিওভুক্ত শিক্ষক নিয়মিতভাবে সাংবাদিকতা করছেন। কেউ জাতীয় দৈনিকের প্রতিনিধি, কেউ অনলাইন নিউজ পোর্টালে সংবাদ প্রকাশ করছেন, কেউ আবার স্থানীয় পর্যায়ে পরিচিত সাংবাদিক হিসেবে সভা–সমাবেশ ও প্রশাসনিক কার্যক্রম কাভার করছেন।
একজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কারা সাংবাদিকতা করছেন, তা উপজেলা পর্যায়ে নতুন কিছু নয়। শিক্ষা অফিসও সব জানে। কিন্তু কোনো অজানা কারণে কখনোই তারা আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু করে না।
এ বিষয়ে সাতকানিয়া মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের একাডেমিক সুপারভাইজার আশীষ বরণ দেব–এর বক্তব্য নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
প্রথমে তিনি দাবি করেন, তাঁর জানা মতে সাতকানিয়ায় কোনো এমপিওভুক্ত শিক্ষক সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত নন। কিন্তু পরবর্তী প্রশ্নের জবাবে তিনি স্বীকার করেন, কয়েকজন এমপিওভুক্ত শিক্ষক সাংবাদিকতা করছেন।
সবচেয়ে বিতর্কিত মন্তব্য আসে এরপর। তিনি বলেন, ওই শিক্ষকরা প্রভাবশালী হওয়ায় তাঁদের নাম প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
শিক্ষা প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন কর্মকর্তার এমন বক্তব্যকে সংশ্লিষ্টরা দায়িত্বহীনতা, ভীতি ও পরোক্ষ প্রশ্রয়ের প্রকাশ হিসেবে দেখছেন।
প্রশ্ন উঠেছে—যদি নীতিমালা লঙ্ঘনকারীরা চিহ্নিত হন, তবে প্রভাবশালীতার অজুহাতে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া কি প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়?
অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা শিক্ষা অফিস ইচ্ছাকৃতভাবে বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছে, যাতে কোনো ‘অস্বস্তিকর পরিস্থিতি’ তৈরি না হয়। ফলে নীতিমালার কড়াকড়ি কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকছে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের অনিয়ম চলতে থাকলে এবং কর্তৃপক্ষ কোনো পদক্ষেপ না নিলে সেটি আর নিছক অবহেলা থাকে না—তা প্রশ্রয়ের পর্যায়ে পড়ে।
একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, একাডেমিক সুপারভাইজার ও উপজেলা শিক্ষা অফিসের দায়িত্ব হলো নীতিমালা বাস্তবায়ন করা। যদি তাঁরা ‘প্রভাবশালী’ শব্দ ব্যবহার করে দায় এড়ান, তাহলে সেটি প্রশাসনিক শৃঙ্খলার জন্য বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, একজন শিক্ষক যদি নিয়মিতভাবে সাংবাদিকতা বা অন্য পেশায় যুক্ত থাকেন, তাহলে পাঠদানের মূল দায়িত্ব ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়বদ্ধতা কমে যায় এবং শিক্ষার গুণগত মান প্রশ্নের মুখে পড়ে।
স্থানীয় অভিভাবকরাও বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাঁদের মতে, নীতিমালা কার্যকর না হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শৃঙ্খলা ও পেশাগত নৈতিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সাতকানিয়ায় এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের সাংবাদিকতায় যুক্ত থাকার বিষয়টি নতুন নয়। কিন্তু নতুন এমপিও নীতিমালার পরও উপজেলা শিক্ষা অফিসের নীরবতা বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করেছে।
এখন প্রশ্ন উঠেছে— উপজেলা শিক্ষা অফিস কি আদৌ নিরপেক্ষ তদন্ত শুরু করবে? নাকি ‘প্রভাবশালী’ অজুহাতে নীতিমালা আবারও কাগজেই বন্দি থাকবে?
স্থানীয় শিক্ষা অঙ্গনে এই প্রশ্নই এখন আলোচনার কেন্দ্রে।











