সজ্জন ও দানশীল সোহাগ নেই—শোকস্তব্ধ গ্রাম, অভিভাবকহীন পরিবার
ঢাকার মিটফোর্ড এলাকায় প্রকাশ্যে ঘটে যাওয়া এক নির্মম হত্যাকাণ্ড কাঁপিয়ে দিয়েছে পুরো দেশকে। নিষ্ঠুরতার শিকার এই মানুষটি ছিলেন লাল চাঁদ ওরফে সোহাগ—একজন সজ্জন ব্যবসায়ী, দানশীল মানুষ এবং প্রিয়জনদের কাছে এক অমূল্য আশ্রয়। আজ তিনি নেই। তাঁর মৃত্যু শুধু একটি জীবন নিয়ে যায়নি, ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে একটি পরিবার, স্তব্ধ করে দিয়েছে একটি পুরো গ্রামকে।
সোহাগের বাড়ি বরগুনার এক প্রত্যন্ত গ্রামে। ছোটবেলা থেকেই ঢাকায় বড় হলেও, গ্রামের মানুষের সঙ্গে তার হৃদ্যতা ছিল গভীর। ঈদ, উৎসব কিংবা যে কোনো খুশির মুহূর্তে ছুটে আসতেন প্রিয় গ্রামের মানুষের কাছে। তার জন্য কোনো দরজা ছিল না বন্ধ। মসজিদে দান, গরিবের চিকিৎসা, ছাত্রদের সহায়তা—সব কিছুতেই তিনি ছিলেন এগিয়ে।
গ্রামের যে মসজিদটির নির্মাণকাজে কিছুদিন আগে এক লাখ টাকা দান করেছিলেন সোহাগ, আজ সেই মসজিদের মিনার নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে, যেন চেয়ে আছে পথের দিকে—যেদিক দিয়ে আর কোনোদিন ফিরবেন না তার প্রিয় দাতা।
প্রবীণ প্রতিবেশী আলম মিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন,
“সোহাগ ছিল আমাদের এলাকার গর্ব। কারো সমস্যা হলে ছুটে আসতো। হাসিমুখে সবার পাশে থাকত। ছোট-বড়, ধনী-গরিব—সবাইকে এক চোখে দেখত। আজ সে নেই, আমাদের আর কেউ রইল না।”
তবে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক চিত্রটি দেখা গেছে তার পরিবারের মাঝে। দশ বছরের ছোট্ট ছেলে সোহান বাবার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলেছে,
“আমার বাবাকে ওরা এভাবে মেরে ফেলল, আমরা এখন কোথায় যাব? কে আমাদের দেখবে? আমার বাবা মানুষকে সাহায্য করত, এখন আমাদেরই তো অন্যের সাহায্যে বাঁচতে হবে।”
চৌদ্দ বছরের মেয়ে সোহানা চোখের পানি মুছতে মুছতে বলেছে,
“আমি আমার বাবার হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। কোনো মেয়ে যেন তার বাবাকে এভাবে হারিয়ে না ফেলে—এ নিশ্চয়তা রাষ্ট্রকে দিতেই হবে। ওরা শুধু আমার বাবাকে মেরে ফেলেনি, আমাদের পুরো পরিবারকে ধ্বংস করে দিয়েছে।”
স্থানীয়দের দাবি, চাঁদা না দেওয়ায় সোহাগকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে ও পাথর ছুড়ে হত্যা করে একদল সন্ত্রাসী। হত্যার সেই বিভৎস ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে নিন্দা ও ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
আজ এক মানবিক হৃদয় থেমে গেছে। একজন সহানুভূতিশীল নাগরিক, পরিবারের ভরসাস্থল, গ্রামের অবলম্বন—সোহাগ আর নেই। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়—এভাবে আর কতজন? এভাবে আর কত পরিবার ধ্বংস হবে?










