ভারতীয় নাগরিকদের ‘বাংলাদেশি’ বলে পুশ-ইন: দিল্লির ভূমিকা নিয়ে ক্ষুব্ধ কলকাতা হাইকোর্ট
ভারতের রাজধানী দিল্লিতে কর্মরত পশ্চিমবঙ্গের ছয়জন পরিযায়ী শ্রমিককে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী আখ্যা দিয়ে সীমান্তে পুশ-ইন করার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় কলকাতা হাইকোর্ট কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে। আদালত জানতে চেয়েছে, সত্যিই যদি এমন ঘটনা ঘটে থাকে, তবে এর পেছনে দায়িত্বশীল মহলের ভূমিকা কী?
বৃহস্পতিবার (১০ জুলাই) বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী ও বিচারপতি ঋতব্রত কুমার মিত্রের ডিভিশন বেঞ্চ এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে (অমিত শাহের দপ্তর) একটি বিস্তারিত রিপোর্ট জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছে। সেই সঙ্গে দিল্লিতে আটক হওয়া ওই ছয় পরিযায়ী শ্রমিকের বর্তমান অবস্থানও জানাতে বলা হয়েছে।
পাশাপাশি, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যসচিবকে দিল্লির মুখ্যসচিবের সঙ্গে সমন্বয় করে এ সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকেও আদালতে পৃথক রিপোর্ট দিতে হবে। মামলার পরবর্তী শুনানি হবে আগামী ১৬ জুলাই।
ঘটনার পেছনের অভিযোগ
বীরভূম জেলার মুরারই ও পাইকর থানার অন্তর্গত দুটি পরিবারের ছয় সদস্য বহু বছর ধরে দিল্লিতে নির্মাণশিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। গত ১৮ জুন দিল্লির কেএন কাটজু থানা এলাকা থেকে তাদের আটক করে পুলিশ। পরিবারসূত্রে জানা যায়, পুলিশ তাদের ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে সন্দেহ করে বিএসএফের হাতে তুলে দেয় এবং সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পুশ-ইন করে দেয়। কোন সীমান্ত দিয়ে পাঠানো হয়েছে, তা জানায়নি কর্তৃপক্ষ।
পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, আটক ব্যক্তিরা দিল্লি থেকে ফোন করে জানিয়েছিলেন যে তারা ভারতীয়, এবং দ্রুত তাদের মুক্তির ব্যবস্থা করার অনুরোধ করেন। কিন্তু পরে পুলিশ জানায়, তারা আর থানায় নেই। তাদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
ঘটনার প্রতিবাদে মুখর হয়েছেন রাজ্যসভার সাংসদ ও পশ্চিমবঙ্গ পরিযায়ী শ্রমিক উন্নয়ন পর্ষদের চেয়ারম্যান সামিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, “বাংলায় কথা বলার অপরাধে” বিজেপি শাসিত রাজ্যের পুলিশ পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিকদের বাংলাদেশে পাঠাচ্ছে। তাঁর দাবি, ভারতীয় নাগরিকত্বের নথি জমা দেওয়ার পরেও দিল্লি প্রশাসন কোনো সদুত্তর দেয়নি।
তিনি আরও বলেন, “যদি সত্যিকারের বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী ধরা পড়ে, নিয়ম মেনে ফেরত পাঠানো উচিত। কিন্তু ভারতীয় পরিচয়পত্র থাকা সত্ত্বেও এমনভাবে পুশ-ইন করা এক ধরনের পরিকল্পিত নিপীড়ন। এ ঘটনায় বড় কোনো চক্রান্ত রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা উচিত।”
স্থানীয় প্রশাসনের বক্তব্য
মুরারই গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান নিতু রবিদাস জানান, “আমাদের এলাকার বাসিন্দাদের আটক করার পর তাদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে নথিপত্র পাঠানো হয়েছিল দিল্লিতে। কিন্তু কোনো সাড়া আসেনি।”
পুশ-ইন হওয়া ব্যক্তিরা
দুই পরিবার থেকে যাদের পুশ-ইন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, তারা হলেন:
সুইটি বিবি (৩৩), কুরবান শেখ (১৫), ইমাম শেখ (৫) – পাইকর থানা
দানিস শেখ (২৯), সোনালী বিবি (২৬), সাবির শেখ (৫) – মুরারই থানা
রাজনৈতিক উত্তাপ
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও এই ইস্যুতে সরব হয়েছেন। তিনি বলেন, দিল্লিতে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর প্রশাসনের একাংশ বাঙালিদের টার্গেট করছে। “বাংলাদেশি” তকমা দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের পরিযায়ী শ্রমিকদের হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
পরিশেষে, কলকাতা হাইকোর্টের নজরে আসার পর বিষয়টি এখন আইনি পথে গড়িয়েছে। আসল সত্য উদঘাটন এবং ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আদালতের পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।










