পাহাড়ে পর্যটকের ঢল, হোটেল-রিসোর্টে ঠাঁই নেই; বাড়তি চাপে সড়কে যানজট
আবুবকর ছিদ্দিক, বার্তা সম্পাদক
পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে মেঘের আনাগোনা, সবুজের হাতছানি আর নীল আকাশের হাতছানিতে পর্যটকদের পদচারণে মুখর হয়ে উঠেছে পার্বত্য জেলা বান্দরবান। শারদীয় দুর্গাপূজার টানা ছুটিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসছেন ভ্রমণপিপাসুরা। কেউ পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে মেঘের সৌন্দর্য উপভোগ করছেন, কেউবা পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুরে দেখছেন পাহাড়ঘেরা পর্যটনকেন্দ্র। পর্যটকের এমন ঢলে শহরের হোটেল-মোটেল ও রিসোর্টগুলোতে এখন শতভাগ বুকিং। আগাম বুকিংয়ে প্রায় পূর্ণ সব আবাসন। কোথাও কোথাও কক্ষ না পেয়ে বিকল্প থাকার জায়গা খুঁজতে হচ্ছে পর্যটকদের।
পূজার ছুটিকে ঘিরে বান্দরবানের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। শহরের মেঘলা ও নীলাচল থেকে শুরু করে দূরের শৈলপ্রপাত, চিম্বুক, নীলগিরি, বগালেক, কেওক্রাডং,থানচি, তমাতুঙ্গীসহ সবখানেই পর্যটকদের উপচে পড়া ভীড় দেখা যাচ্ছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের ভিড়ে জমজমাট থাকছে এসব কেন্দ্র। পর্যটকের বাড়তি চাপে শহরের প্রধান সড়ক ও পাহাড়ি পথেও তৈরি হচ্ছে যানজট। বিশেষ করে মেঘলা ও নীলাচলগামী সড়কে ব্যক্তিগত গাড়ি, মাইক্রোবাস ও পর্যটকবাহী বাসের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে।
পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এবারের দুর্গাপূজার ছুটিতে গত বছরের তুলনায় পর্যটকের চাপ বেশি। এতে হোটেল-রিসোর্টের পাশাপাশি পরিবহন, খাবারের দোকান ও পর্যটনকেন্দ্র-ঘিরে গড়ে ওঠা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও বেড়েছে ব্যস্ততা।
বান্দরবান শহরের অন্যতম আকর্ষণ নীলাচল ও মেঘলা পর্যটনকেন্দ্রে সকাল থেকেই ছিল দর্শনার্থীদের ভিড়। পাহাড়ের ওপর থেকে বিস্তৃত প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখা, ছবি তোলা এবং পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটাতে ব্যস্ত ছিলেন পর্যটকেরা। একই চিত্র দেখা গেছে চিম্বুক ও নীলগিরিতেও।
পর্যটনকেন্দ্রগুলোর টিকিট কাউন্টারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা জানান, কোনো কোনো কেন্দ্রে প্রতিদিন গড়ে তিন হাজারের বেশি প্রবেশ টিকিট বিক্রি হচ্ছে। নীলাচল পর্যটনকেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা জানান, পূজার ছুটিতে সকাল থেকে এখন পর্যন্ত আড়াই হাজারের বেশি পর্যটক প্রবেশ করেছেন। দিনের বাকি সময়ে এ সংখ্যা চার হাজারে পৌঁছাতে পারে বলে তাঁদের ধারণা।
পর্যটকের বাড়তি চাপে সবচেয়ে বেশি সংকট তৈরি হয়েছে আবাসন নিয়ে। শহরের আবাসিক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টগুলোর অধিকাংশ কক্ষ আগেই বুকিং হয়ে গেছে। ফলে আগে থেকে বুকিং না দিয়ে আসা অনেক পর্যটককে থাকার জায়গা খুঁজতে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
টাঙ্গাইল থেকে আসা রোমান বলেন, ‘হোটেল না পেয়ে কিছুটা সমস্যায় পড়তে হয়েছে। তবে পাহাড়ের সৌন্দর্য সব কষ্ট ভুলিয়ে দিয়েছে।’
ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে প্রথমবার বান্দরবানে বেড়াতে এসেছেন মিজবাহ। তিনি বলেন, কয়েকটি পর্যটনকেন্দ্র ঘুরে দেখেছেন তাঁরা। এর মধ্যে নীলাচল সবচেয়ে ভালো লেগেছে।
গাজীপুর থেকে আসা সবুজ বলেন, ‘এর আগেও অনেকবার বান্দরবানে এসেছি। যতবারই আসি, ততবারই ভালো লাগে। পাহাড় আর প্রাকৃতিক পরিবেশ আমাকে বিমোহিত করে। সুযোগ পেলেই বান্দরবানে ছুটে আসি।’
জেলা হোটেল ও রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ‘শারদীয় দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে এবার গত বছরের তুলনায় পর্যটকের চাপ বেশি। অনেক পর্যটক হোটেল না পেয়ে সাধারণ মানের আবাসনে কিংবা আত্মীয়স্বজনের বাসায় অবস্থান করছেন। তবে আমরা পর্যটকদের সেবায় সবসময় নিয়োজিত আছি।’
পর্যটকদের আনাগোনায় ব্যস্ত সময় পার করছেন পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও। জিপ-মাইক্রোবাস মালিক সমিতির লাইনম্যান মো. কামাল হোসেন বলেন, সকাল থেকে প্রতিটি গাড়িতে ১২ থেকে ১৩ জন করে পর্যটক নিয়ে প্রায় ৩০০টি পর্যটকবাহী গাড়ি বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রের উদ্দেশে ছেড়ে গেছে।
তবে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ায় যানজটও বেড়েছে। বিশেষ করে জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রগুলোর প্রবেশপথ ও পাহাড়ি সড়কে গাড়ির চাপ বেশি থাকছে। এতে কোথাও কোথাও পর্যটকদের গন্তব্যে পৌঁছাতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় লাগছে।
পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে দায়িত্ব পালন করছে ট্যুরিস্ট পুলিশ। বান্দরবান পুলিশ সুপার ওহাবুল ইসলাম খন্দকার বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে জেলার প্রতিটি পর্যটনকেন্দ্রে ট্যুরিস্ট পুলিশ কাজ করছে। ভ্রমণে এসে কেউ অপ্রীতিকর ঘটনার মুখোমুখি হলে জেলা ট্যুরিস্ট পুলিশের ওয়েবসাইটে দেওয়া নম্বরে যোগাযোগ করে সহায়তা নিতে পারবেন।
জেলা প্রশাসক নাজনীন সুলতানা বলেন, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দুর্গাপূজার পরপরই বৌদ্ধদের প্রবারণা উৎসব থাকায় এবার পর্যটকদের ভিড় বেড়েছে। দুর্গাপূজা ও সাপ্তাহিক ছুটির পর ২৫ থেকে ২৭ অক্টোবর মারমা বৌদ্ধদের ঐতিহ্যবাহী ওয়াগ্যোয়াই পোয়ে বা প্রবারণা উৎসব অনুষ্ঠিত হবে। এ উৎসব ঘিরেও পর্যটকদের আগ্রহ রয়েছে। এরপর আবার দুই দিনের সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় মাসের শেষ পর্যন্ত বান্দরবানে পর্যটকদের ভিড় থাকবে বলে আশা করছেন তাঁরা। পর্যটকদের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি টিকিট ব্যবস্থাপনা ও যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
পূজার ছুটিতে পর্যটকদের এই ঢল পাহাড়ি জেলার পর্যটননির্ভর ব্যবসায় নতুন গতি এনেছে। তবে বাড়তি পর্যটকের বিপরীতে পর্যাপ্ত আবাসন, যানজট নিয়ন্ত্রণ ও নির্বিঘ্ন ভ্রমণ নিশ্চিত করাই এখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।








