আইনগত প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন
আগে পুলিশে আটক, পরে ইউএনও’র মোবাইল কোর্টে সাজা
সম্প্রতি চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানে পুলিশের হাতে আটক কয়েকজনকে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে সোপর্দ না করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে হাজির করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা দেওয়ার ঘটনায় আইনগত প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে আটক ব্যক্তিদের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে বা তাঁর সামনে অপরাধ সংঘটনের সময় আটক করা হয়নি—এমন পরিস্থিতিতে তাদের পুলিশ প্রথমে আটক করে পরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে নিয়ে গিয়ে মোবাইল কোর্টে সাজা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে বলে জানা গেছে।
সম্প্রতি দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে একই ধরনের একটি ঘটনায় জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ব্যাখ্যা চাওয়ার পর সাতকানিয়ার ঘটনাটিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
সাতকানিয়া থানা সূত্রে জানা গেছে, মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানের অংশ হিসেবে গত ২২ সেপ্টেম্বর পুলিশ ছয়জনকে আটক করে। এরপর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সোপর্দ না করে সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রাজিব দাশ পুরকায়স্থের কার্যালয়ে হাজির করা হয়। সেখানে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে তাদের সাজা দেন ইউএনও।
ঘটনাটির এখানেই মূল আইনগত প্রশ্নটি তৈরি হয়েছে—পুলিশের অভিযানে আগে আটক হওয়া ব্যক্তিদের পরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে নিয়ে গিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতে বিচার করা হলে, সেটি মোবাইল কোর্ট আইনের নির্ধারিত এখতিয়ার ও প্রক্রিয়ার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ?
মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯-এর ৬ ধারায় ক্ষমতাপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নির্দিষ্ট তফসিলভুক্ত অপরাধ তার “সম্মুখে সংঘটিত বা উদ্ঘাটিত” হলে তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলেই আমলে নিয়ে, অভিযুক্ত ব্যক্তি অভিযোগ স্বীকার করলে আইনে নির্ধারিত দণ্ড দিতে পারেন। অর্থাৎ মোবাইল কোর্টের ক্ষমতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—অপরাধটি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে সংঘটিত বা তাঁর সামনে উদ্ঘাটিত হওয়া এবং আইনে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা।
আর আইনের ৭ ধারায় বলা হয়েছে, অভিযোগ আমলে নেওয়ার পর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে লিখিতভাবে সংক্ষিপ্ত অভিযোগ গঠন করে তা অভিযুক্ত ব্যক্তিকে পড়ে ও বুঝিয়ে শুনাতে হবে। অভিযুক্ত ব্যক্তি অভিযোগ স্বীকার করলে সেই স্বীকারোক্তি লিখিতভাবে লিপিবদ্ধ করতে হবে এবং অভিযুক্ত ও উপস্থিত সাক্ষীদের স্বাক্ষর বা টিপসই নেওয়ার বিধান রয়েছে।
সাতকানিয়ার ঘটনায় পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ছয় ব্যক্তিকে প্রথমে পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযানে আটক করা হয়। পরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে নিয়ে গিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। তাহলে আইনগতভাবে প্রশ্ন উঠতেই পারে, মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯-এর ৬ ধারায় বর্ণিত “তাহার সম্মুখে সংঘটিত বা উদ্ঘাটিত” শর্তটি কীভাবে পূরণ হলো। কারণ, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট যদি আটকের সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকেন এবং পরে তাদের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করে, তাহলে সেই ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে মোবাইল কোর্টের তাৎক্ষণিক বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগের ভিত্তি কী ছিল?
ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ৬১ ধারায় বিশেষ ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ ছাড়া গ্রেপ্তারের পর ২৪ ঘণ্টার বেশি পুলিশ হেফাজতে রাখার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আর ১৬৭ ধারায় বলা হয়েছে, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত শেষ করা সম্ভব না হলে এবং অভিযোগের ভিত্তি থাকার মতো কারণ থাকলে পুলিশকে নিকটস্থ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে মামলার ডায়েরির সংশ্লিষ্ট অংশ পাঠানোর পাশাপাশি আসামিকে সেই ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠাতে হবে।
এ কারণে সাতকানিয়ার ঘটনায় যদি ছয় ব্যক্তিকে পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার করে থাকে এবং পরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে হাজির করা হয়ে থাকে, তাহলে সেই প্রক্রিয়াটি ফৌজদারি কার্যবিধির সংশ্লিষ্ট বিধানের সঙ্গে কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ—তা প্রশ্নের বিষয়।
দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে সম্প্রতি মাদকবিরোধী অভিযানে আটক পাঁচ ব্যক্তিকে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে সোপর্দ না করে সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে নিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজা দেওয়ার ঘটনায় ঘোড়াঘাট আমলি আদালতের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. মোস্তানছির রহমান আইনগত প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
গত ১৬ সেপ্টেম্বর মিস কেস নং-০১/২০২৬ (ঘোড়াঘাট) মামলায় দেওয়া আদেশে তৎকালীন ওসি মো. শহিদুল ইসলামকে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। তাকে আগামী ২৭ অক্টোবর সকাল ১০টায় আদালতে স্বশরীরে হাজির হয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে অভিযানসংক্রান্ত জিডি, আটক ব্যক্তিদের সোপর্দকরণ, ফরওয়ার্ডিংসহ প্রয়োজনীয় নথি আদালতে উপস্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঘোড়াঘাটের আদেশে ফৌজদারি কার্যবিধির ৬১ ও ১৬৭ ধারার বিধানও উল্লেখ করা হয়েছে।
আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, পুলিশ আটক ব্যক্তিদের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির না করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট/সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে পাঠিয়েছে। ফলে ওই প্রক্রিয়া আইন ও বিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা ব্যাখ্যার প্রয়োজন রয়েছে।
জানা যায়, গত ১৫ সেপ্টেম্বর ঘোড়াঘাটের সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আব্দুল্লাহ আল-মামুন কাওসার শেখ ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম পরিচালনা করেন। ওই কার্যক্রমে পাঁচজনের মধ্যে চারজনকে ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং একজনকে সাত দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই সঙ্গে প্রত্যেককে ১০০ টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।
ঘোড়াঘাটের ঘটনার সঙ্গে সাতকানিয়ার ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিল হলো—পুলিশের হাতে আটক ব্যক্তিদের পরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা দেওয়া হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
আইনজীবীদের মতে, মোবাইল কোর্টের ক্ষেত্রে ঘটনাস্থল ও থানায় নিয়ে যাওয়ার পরবর্তী পর্যায় এক বিষয় নয়। কোনো অপরাধ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে উদ্ঘাটিত হলে তিনি আইনে নির্ধারিত শর্তে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে পারেন। কিন্তু পুলিশ আগে কাউকে আটক করে থানায় নিয়ে যাওয়ার পর সেই ব্যক্তিকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে হাজির করলে সেই প্রক্রিয়ার আইনগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সহাকারী পাবলিক প্রসিকিউটর আইনজীবী মুহাম্মদ এনামুল হক বলেন, ‘মোবাইল কোর্ট আইনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দিষ্ট ক্ষমতা রয়েছে। বিশেষ করে মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯-এর ৬ ধারায় অপরাধ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ‘সম্মুখে সংঘটিত বা উদ্ঘাটিত’ হওয়ার যে বিষয়টি বলা হয়েছে, সেটি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। আটকের সময় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ঘটনাস্থলে না থাকলে এবং পুলিশ পরে আটক ব্যক্তিদের তাঁর কাছে নিয়ে গেলে, সেই ব্যক্তিদের মোবাইল কোর্টে বিচার করার আইনগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।’
এ বিষয়ে জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে সাতকানিয়ার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আব্দুল আলীম জানান, তিনি যোগদানের পর থেকে গত এক সপ্তাহে মাদকবিরোধী অভিযানে ৩০ জনের মতো আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকজনকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে হাজির করে সাজা দেওয়া হয়েছে বলে স্বীকার করেন তিনি।
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট যদি আটকের সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকেন এবং পুলিশই আগে ব্যক্তিদের আটক করে পরে তাদের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করার বিষয়ে জানতে চাইলে মন্তব্য করতে রাজি হননি ওসি।
অন্যদিকে, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকারী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাজীব দাশ পুরকায়স্থের মুঠোফোনে কল করা হলেও তিনি রিসিভ না করায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।








