বিপ্লবের পতনের পরও সবুজের উত্থান থামেনি
বিপ্লব বড়ুয়ার আশীর্বাদপুষ্ট প্রকৌশলী এখনো সাতকানিয়ায় বহাল
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের প্রশাসনে বড় ধরনের রদবদল এলেও সাতকানিয়া উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) চিত্র ভিন্ন। গত বছরের ৯ এপ্রিল যোগদান করা উপজেলা প্রকৌশলী সবুজ কুমার দে এখনো বহাল তবিয়তে। অভিযোগ, তিনি সাতকানিয়ায় এ পদে এসেছিলেন তৎকালীন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় দফতর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়ার আশীর্বাদে—এবং ক্ষমতার পালাবদলের পরও সেই আশীর্বাদের প্রভাব আজও টিকে আছে।
বিপ্লব বড়ুয়া আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় দফতর সম্পাদক ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী, একই সঙ্গে চট্টগ্রামের প্রভাবশালী নেতা। তাঁর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কিছু কর্মকর্তার তালিকা ছিল। সেই তালিকায় সবুজ কুমার দে’র নামও ছিল। একাধিক সূত্র নিশ্চিত করে, সবুজ কুমার দে সাতকানিয়ায় আসেন “বিপ্লব বড়ুয়ারই বিশেষ সুপারিশে”।
সবুজ কুমার দে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই এলজিইডির প্রকল্প বণ্টন, টেন্ডার অনুমোদন এবং মাঠপর্যায়ের কাজের ধরনে পরিবর্তন আসে। স্থানীয় ঠিকাদারদের একাংশের অভিযোগ—আগে যেখানে বিভিন্ন ইউনিয়নের ঠিকাদাররা প্রতিযোগিতামূলকভাবে কাজ পেতেন, এখন কাজ পেতে হলে “প্রকৌশলীর ঘনিষ্ঠতা” অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঠিকাদার বলেন, সাতকানিয়ায় যে কয়টা বড় প্রকল্প আছে, সবই নির্দিষ্ট দলের লোক পাচ্ছে। আগে তিন–চারজন ইউনিয়ন পর্যায়ের ঠিকাদার কাজ পেতেন, এখন অফিসের ‘চেনাজানা’ না হলে টেন্ডারই জমা দিতে পারি না।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে ঘটে যায় ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পরিবর্তন। এদিন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। প্রশাসনের বহু কর্মকর্তা তদন্তের মুখে পড়েন, কেউ বদলি হন, কেউ সাময়িক বরখাস্ত। কিন্তু সাতকানিয়া এলজিইডির অফিসে কোনো পরিবর্তন হয়নি। সবুজ কুমার দে এখনো আগের মতোই অফিস পরিচালনা করছেন। স্থানীয়দের ভাষায়, বিপ্লব বড়ুয়া চলে গেছেন, কিন্তু তার ছায়া এখনো অফিসে ঘোরাফেরা করছে।
সাতকানিয়া এলজিইডি অফিসের নথি ঘেঁটে দেখা যায়, এখন পর্যন্ত মোট ৪৩টি উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলছে। এর মধ্যে অধিকাংশ কাজ পেয়েছেন নির্দিষ্ট ঠিকাদার।
একজন ঠিকাদার অভিযোগ করেন, নতুন প্রশাসন আসার পর ভেবেছিলাম এবার টেন্ডার প্রক্রিয়া বদলাবে। কিন্তু এখনো আগের মতোই চলছে—যাদের সঙ্গে প্রকৌশলীর সম্পর্ক ভালো, তারাই কাজ পাচ্ছেন। এদিকে মাঠপর্যায়ের তদন্তে দেখা গেছে, কয়েকটি প্রকল্পে কাজের গুণগত মান প্রশ্নবিদ্ধ।
স্থানীয় এক শিক্ষক বলেন, উনি রাজনীতির প্রভাবে এসেছিলেন—এটা সবাই জানে। এখন সরকার বদলে গেছে, কিন্তু উনি থেকে গেছেন। এটা বুঝে উঠতে পারছি না, কার প্রভাবে তিনি এখন আছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার প্রকৌশল দপ্তরগুলোর মধ্যে এলজিইডি সবসময়ই রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল। কারণ, এখানে উন্নয়ন প্রকল্প মানেই অর্থনৈতিক প্রভাব। তাই দলীয় সুপারিশে কর্মকর্তারা আসেন, এবং তারা জানেন—ক্ষমতার পালাবদলেও টিকে থাকতে হলে কৌশল বদলাতে হবে, অবস্থান নয়।
তাদের মতে, সবুজ কুমার দে সেই কাঠামোরই অংশ। যেভাবে বিপ্লব বড়ুয়ার প্রভাবে তিনি পদে এসেছিলেন, এখন হয়তো নতুন শক্তির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন।
কেউ কেউ মনে করেন, দেশে কিছু কর্মকর্তা এমন এক নেটওয়ার্ক গড়ে ফেলেছেন, যা রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে। হয়তো সেই প্রভাবেই তিনি এখনো বহাল আছেন।
এক বছর পেরিয়ে গেছে। ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া এখন বিদেশে নির্বাসিত, কিন্তু সাতকানিয়া উপজেলা প্রকৌশলী সবুজ কুমার দে এখনো সেই চেয়ারে বসে আছেন।
স্থানীয় এক সাংবাদিক বলেন, বিপ্লব বড়ুয়া চলে গেছেন, কিন্তু তার প্রশাসনিক উত্তরাধিকার এখনো সক্রিয়। সাতকানিয়া অফিসে সেটা দেখলেই বোঝা যায়।
সাতকানিয়ার এক প্রবীণ নাগরিকের ভাষায়, এখানে এখন একটা কথা চলে—ক্ষমতা বদলায়, কিন্তু সবুজ বদলায় না।








