এক দফা আন্দোলনের বিস্ফোরণমুখর দিন
গতবছরের ৪ আগস্ট সাতকানিয়ায় গর্জে উঠেছিল জনতা, কেঁপে উঠেছিল ক্ষমতা
এক বছর আগে এই দিনে চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় রাজনীতির ইতিহাসে নতুন এক বাঁক রচিত হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা সরকার পতনের এক দফা কর্মসূচির অংশ হিসেবে সাতকানিয়া পরিণত হয়েছিল এক বিশাল আন্দোলনমুখর মঞ্চে। আন্দোলনে কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষার্থী, পথচারী, রিকশাচালক—সব শ্রেণি-পেশার মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন।
এই জনপদের রাজপথে ওইদিন একটা রাষ্ট্রের প্রতিচ্ছবি ভেঙে পড়ে। ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ মিছিলে কেবল হুঙ্কারই ছিল না, ছিল জনগণের জমে থাকা হতাশা, ক্ষোভ, অধিকারহীনতার দীর্ঘশ্বাস। এই দিনটি এখন সাতকানিয়ার ইতিহাসে পরিচিত হয়ে উঠেছে ‘জুলাই দ্রোহের আগস্ট বিস্ফোরণ’ হিসেবে।
সারাদেশে তখন ছড়িয়ে পড়ে সরকার পতনের এক দফা দাবিতে ছাত্র-জনতার আন্দোলন। চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলায় এর প্রতিধ্বনি পড়ে ৪ আগস্ট। “বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন” নামে সংগঠিত একটি নেটওয়ার্ক গোপনে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালাতে থাকে। ৩ আগস্ট রাতে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে একটি বার্তা ছড়িয়ে পড়ে— “৪ আগস্ট দুপুর ৩টায় মিঠাদিঘী থেকে কেরানীহাট পর্যন্ত জনগণের পদচারণা হবে”।
৪ আগস্ট, ২০২৪। মিঠাদিঘী এলাকায় জমায়েত হতে থাকে তরুণ-তরুণী, কৃষক-শ্রমিক, রিকশাচালক, দোকানদার। দুপুর ৩টায় হাতে হাত ধরে তারা হাঁটতে শুরু করে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে। লক্ষ্য ৫ কিলোমিটার দূরে কেরানীহাট স্টেশনে জমায়েত। স্লোগান ওঠে— এক দফা, স্বৈরাচারের পতন চাই। স্বৈরাচার নিপাত যাক, জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠা পাক। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, এ ছিল বিগত এক দশকে সবচেয়ে জনসম্পৃক্ত এবং শক্তিশালী একটি গণমিছিল।
দুপুর সাড়ে ৩টা বাজতে না বাজতেই প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ মহাসড়ক আন্দোলনকারীদের দখলে চলে যায়। কেরানীহাট হক টাওয়ারের সামনে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তখন অবস্থান করছিল সরকারি দল সমর্থিত আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা।
সেদিন ঘটনাস্থলে ছিলেন কয়েকজন সাংবাদিক। গাজী টিভির প্রতিনিধি হারুন-অর-রশিদ বলেন, ‘আমরা কয়েকজন সাংবাদিক কেরানীহাট স্যোশাল ইসলামী ব্যাংকের ছাদে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলাম। নিচে দেখি ৪-৫ জন ছাত্রলীগ-যুবলীগ কর্মী মোটরসাইকেলে অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে। আমাদের উপর থেকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ছাত্রলীগের এক সদস্য মোবাইলে ফোন করে জানতে চায়—আমরা ভিডিও করছি কিনা। হুমকির সুরে জানায়, “পোলাপাইন আপনাদের উপর হামলা করতে চায়, আপনারা উপরে কেন?” আমি তৎক্ষণাৎ সবাইকে অফিসের ভেতরে ঢুকে যেতে বলি।’
তিনি জানান, হুমকির পরপরই সাংবাদিকরা অফিসের জানালার আড়ালে লুকিয়ে পড়েন। তখন তারা প্রত্যক্ষ করেন—এক সাধারণ পথচারীর মোবাইল ও ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে। পরক্ষণেই একই পরিণতি ঘটে আরও কয়েকজন রিকশাচালকের।
ঠিক তখনই দূর থেকে এগিয়ে আসে ছাত্র-জনতার বিশাল মিছিল। স্লোগানের গর্জন শুনে ছাত্রলীগ-যুবলীগ ক্যাডাররা হক টাওয়ারের সামনে থেকে গুলি ছোঁড়ে। কিন্তু গুলির সামনে থেমে যায় না মিছিল। মিছিলের গণজোয়ার দেখে তারা হক টাওয়ার এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, মিছিলকারীরা তখনো থামেনি। বরং আরও শক্তিশালীভাবে এগিয়ে আসে। ছাত্রলীগ-যুবলীগের ক্যাডররা গুলি ছুড়ে দৌড়ে পালিয়ে যায়। কেরানীহাট মোড় যেন যুদ্ধক্ষেত্র। বিক্ষোভকারীরা কেরানীহাটে অবস্থান নেয়। এসময় ছাত্রলীগ-যুবলীগের ফেলে যাওয়া মোটরসাইকেল আগুনে পুড়িয়ে ফেলে জনতা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কেরানিহাটে পুলিশের কেউ ছিল না। প্রশাসন পুরোপুরি গায়েব। সন্ধ্যার দিকে বিক্ষোভকারীরা স্থান ত্যাগ করলে যান চলাচল ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা তখন বলেছিলেন, ‘এক দফা দাবিতে রাস্তায় নেমেছি। ঘরে ফিরব না, স্বৈরাচার পতন না হওয়া পর্যন্ত। আমরা একটি নতুন যুদ্ধ শুরু করেছি।’
তাদের বক্তব্যে ছিল এক ধরনের দৃঢ়তা ও বিশ্বাস—‘গণভবন স্বৈরাচারীর নয়, জনগণের ভবন। সময় এসেছে নতুন দিনের। সময় এসেছে বৈষম্যহীন বাংলাদেশের।’
আজ, এক বছর পর সাতকানিয়ার মানুষ সেই দিনটির কথা স্মরণ করে বলেন—সেদিন ছিল ভয় আর সাহসের মিশ্রণ। অনেকে বলছেন, সকালেও ভেবেছিলাম আন্দোলন দুর্বল হবে, কিন্তু দুপুরে দেখলাম—শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, আশপাশের গ্রামের মানুষ, দোকানি, রিকশাচালক পর্যন্ত রাস্তায় নেমে গেছে।
তৎকালীন প্রশাসনের নীরব ভূমিকাও ছিল সমালোচনার কেন্দ্রে। একজন স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, সকালে ছাত্রলীগ-যুবলীগের অস্ত্রধারীদের দখলে ছিল কেরানীহাট এলাকা। অথচ কোনো পুলিশ ছিল না। বরং পুলিশের অনুপস্থিতিই ইন্ধন জুগিয়েছে তাদের আগ্রাসনে।
আজও একটি প্রশ্ন রয়ে গেছে—কেরানীহাট মোড়ে ছাত্রলীগ-যুবলীগের গুলির নির্দেশদাতা কে? কারা এনেছে নতুন ধরনের অস্ত্র? কেন প্রশাসন উপস্থিত ছিল না? এই প্রশ্নগুলো উত্তরহীন থেকে গেছে।
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট কেবল একটি বিক্ষোভের দিন ছিল না। সেটি ছিল সরকারি দমন নীতির মুখে জনতার সামষ্টিক প্রতিবাদের এক উজ্জ্বল দিন। সাতকানিয়ার মানুষ সেই দিনটিকে আজও স্মরণ করে আতঙ্ক ও গৌরবের মিশ্র আবহে। ৪ আগস্ট ২০২৪ ছিল রাষ্ট্রের মুখোমুখি হওয়া এক সাহসী তরুণ প্রজন্মের দিন। কেরানীহাটের রাস্তা সেদিন ছিল শুধু এক টুকরো মাটি নয়, ছিল এক বিস্ফোরিত সত্যের রণক্ষেত্র।
জনগণ সেদিন প্রমাণ করেছিল—নিরবতা আর চলে না। সময় এসেছে ঘুরে দাঁড়ানোর। আর তাই এক বছর পর, সাতকানিয়ার মানুষ এখনো বলেন— “আমরা ভুলিনি, ভুলব না—আগস্টের সেই আগুনঝরা দিন।”








