দায়িত্ব গ্রহণের তিনদিনেই বিতর্কিত
নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতার কাছ থেকে ফুল নিলেন সাতকানিয়ার নতুন ইউএনও
চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় সদ্য যোগদান করা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান দায়িত্ব গ্রহণের তিনদিন না পেরুতেই বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছেন। সরকারি দায়িত্ব পালনের তৃতীয় দিনেই তিনি ফুলের তোড়া গ্রহণ করেছেন নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ও বর্তমান উপজেলা কৃষক লীগের সহ-সভাপতি মুন্সী আব্দুর রব সৌরভের কাছ থেকে। এই ঘটনায় প্রশাসনিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে—একজন সরকারি কর্মকর্তা কেন রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত ব্যক্তির কাছ থেকে এভাবে ‘শুভেচ্ছা’ গ্রহণ করবেন?
মুন্সী আব্দুর রব সৌরভ একসময় ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন। পরে নিজেকে কৃষক লীগের রাজনীতিতে যুক্ত করেন। বর্তমানে উপজেলা কৃষক লীগের সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর বিরুদ্ধে প্রভাব বিস্তার করার অভিযোগ রয়েছে বহুদিন ধরে। অথচ এই ব্যক্তি থেকে ‘সৌজন্য ফুল’ গ্রহণ করলেন ইউএনও!
ইউএনও খোন্দকার মাহমুদুল হাসানকে এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘ওনি নিষিদ্ধ সংগঠনের পরিচয়ে আসেননি। অন্য কোনো এক পরিচয়ে এসেছেন। যে পরিচয়ে যাদের সাথে এসেছেন, তাদেরকে প্রশ্ন করুন।’
কিন্তু সচেতন মহলের মতে, এই ব্যাখ্যা দায়িত্বহীন ও অসংগত। একজন সচেতন নাগরিক বলেন, ‘একজন সরকারি কর্মকর্তা যদি নিজের অফিস কক্ষে কে আসছে, সে কার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট—তা না জেনে সাক্ষাৎ করেন, তাহলে তিনি তো প্রশাসনিকভাবে অন্ধভাবে কাজ করছেন। এটা গ্রহণযোগ্য নয়।’
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাতকানিয়া উপজেলা সমন্বয় কমিটির প্রধান সমন্বয়কারী মো. তহীদুল ইসলাম মাছুম বলেন, ‘এই সময়ে এসে কোন আওয়ামী লীগ নেতা প্রশাসনের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করার সাহসকে আমরা আওয়ামী পূনর্বাসনের অংশ হিসেবে দেখি। উনি নতুন এসেছেন তাই অনেক কিছু হয়তো জানেন না। ভবিষ্যতে এই রকম বিষয়ে উনার আশেপাশের মানুষের উনাকে জানানো উচিত ।’
সাতকানিয়ায় প্রশাসনের ওপর স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের দখল নতুন কিছু নয়। এর আগে যারা ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, তাঁদের বেশিরভাগই স্থানীয় এমপি, আওয়ামী লীগ নেতাদের ছত্রছায়ায় কাজ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি কোনো কোনো ইউএনওকে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অল্প সময়ে বদলিও করা হয়েছে।
সরকারি হিসেবে আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন বর্তমানে নিষিদ্ধ। গত বছর ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতন ঘটলে সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করে সরকার। আওয়ামী লীগ ছাড়াও এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনও বর্তমানে নিষিদ্ধ। এমন একটি সংগঠনের সাবেক নেতার সঙ্গে ইউএনওর ‘উষ্ণ সম্পর্ক’ প্রতিষ্ঠা অনেকের কাছে প্রশাসনিক শিষ্টাচারের লঙ্ঘন বলেই মনে হয়েছে। নতুন বাংলাদেশে ইউএনওর সঙ্গে তাঁর সরাসরি সম্পর্ক জনগণকে আশঙ্কিত করে তুলেছে।
প্রশাসনিক দায়িত্ব একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। একজন ইউএনওকে শুধু সরকারি দায়িত্বই নয়, নৈতিক ও সামাজিক মানদণ্ডেও উত্তীর্ণ হতে হয়। সাতকানিয়ার মতো রাজনীতিপ্রবণ উপজেলায় দায়িত্ব নেয়ার পর তিনদিনের মধ্যেই বিতর্কিত রাজনৈতিক নেতার ফুল গ্রহণ একটি গভীর বার্তা দেয়—এখানে প্রশাসন আবারও আওয়ামী ছায়ায় ঢুকছে কি না, সেই প্রশ্নের মুখে প্রশাসন আজ।
সচেতন মহল দাবি জানিয়েছে, ইউএনও মাহমুদুল হাসানের এই কাজের জন্য প্রশাসনের উচ্চ পর্যায় থেকে তদন্ত হওয়া উচিত এবং সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী তাঁর ভূমিকা পর্যালোচনা করা উচিত।








