লক্ষ লক্ষ মুসল্লির ‘আমিন, আমিন’ ধ্বনিতে চুনতীর সীরত মাহফিলের সমাপ্তি
১৯ দিনের ঐতিহাসিক আয়োজন শেষে শান্তি, ঐক্য ও মানবিক সমাজ গঠনে রাসূলের আদর্শ অনুসরণের আহ্বান
শনিবার বিকেল গড়াতেই চেনা চুনতী যেন বদলে গেল। সড়কজুড়ে মানুষের ঢল, চুনতী বাজারের দক্ষিণে শাহ সাহেব গেইটের প্রবেশ দ্বারে সাদা টুপি ও পাঞ্জাবি পরিহিত মুসল্লির স্রোত, দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসা মানুষের পদচারণা—সব মিলিয়ে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
চুনতীর ১৩ একরজুড়ে বিস্তৃত শাহ্ মনজিল সীরত ময়দান ছাপিয়ে মানুষের ভিড় ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের সড়ক ও জনপদে।
কারও গন্তব্য মাহফিলের মূল প্যান্ডেল, কারও অপেক্ষা আখেরি মোনাজাতের।
চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা ছাড়িয়ে কক্সবাজার ও বান্দরবানসহ দেশের নানা প্রান্ত থেকে লাখো মানুষ এসে জড়ো হন চুনতীতে। মানুষের এই ঢলে একপর্যায়ে বদলে যায় পুরো লোহাগাড়ার স্বাভাবিক দৃশ্যপট।
লক্ষ লক্ষ মুসল্লির সম্মিলিত ‘আমিন, আমিন’ ধ্বনি, দরুদ-সালাম ও মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শনিবার শেষ রাতে চুনতীতে সমাপ্ত হয়েছে ১৯ দিনব্যাপী ৫৬তম আন্তর্জাতিক মাহফিলে সীরাতুন্নবী (সা.)।
১৯৭২ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে ৫৫ বছর ধরে চলে আসা এই মাহফিলকে ঘিরে এবারও পুরো লোহাগাড়ায় বিরাজ করেছে ভিন্ন এক আমেজ।
মাহফিলের বিশেষত্ব শুধু বিশাল জনসমাগমে নয়; টানা ১৯ দিন ধরে এখানে চলে এক ব্যতিক্রমী আয়োজন। মাহফিলে আগত মানুষের জন্য প্রতিদিনই থাকে খাবারের ব্যবস্থা। বিশাল মূল প্যান্ডেলে চলে সীরাতুন্নবী (সা.)-এর আলোচনা। ক্ষুধা লাগলে পাশের খাবারের প্যান্ডেলে গিয়ে খাবার খেয়ে আবার মূল প্যান্ডেলে ফিরে আসেন মুসল্লিরা।
ধর্মীয় আলোচনা, ইবাদত এবং আগত মানুষের জন্য খাবারের এই সমন্বিত আয়োজনই চুনতীর মাহফিলকে দিয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য।
মানবিক চিন্তা থেকেই খাবারের আয়োজন
মাহফিল পরিচালনা কমিটি ও শাহ মঞ্জিল চুনতীর প্রেস সচিব মোহাম্মদ সোহেল তাজ বলেন, মাহফিলের সঙ্গে খাবারের ব্যবস্থা যুক্ত করার পেছনে ছিল শাহ সাহেবের একটি মানবিক চিন্তা। তিনি মনে করতেন, দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ওয়াজ শুনতে এসে যেন না খেয়ে থাকতে বাধ্য না হন।
পুরোনো বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি বলতেন—ওয়াজ শুনে মানুষ উপবাসে থেকে রাতে বাড়ি ফিরে স্ত্রী-সন্তানদের ওপর যেন বাড়তি কষ্ট না চাপায়, সে জন্যই খাবারের এই ব্যবস্থা।
এরপর বছর গড়িয়েছে, মাহফিলের পরিধি বেড়েছে, মানুষের সংখ্যা বেড়েছে; কিন্তু খাবারের এই আয়োজন বন্ধ হয়নি।
তিনি বলেন, এবারও ১৯ দিনব্যাপী মূল মাহফিলের পাশেই খাবারের প্যান্ডেলে মানুষের জন্য খাবারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
ফলে একজন মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা মাহফিলে অবস্থান করলেও খাবারের জন্য তাকে আলাদা কোথাও যেতে হয় না।
মূল প্যান্ডেলে সীরাতের আলোচনা শুনছেন, প্রয়োজন হলে পাশের প্যান্ডেলে গিয়ে খাবার খেয়ে আবার ফিরে আসছেন—দীর্ঘ এই আয়োজনের মধ্যে এটিই চুনতীর মাহফিলের অন্যতম ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য।
সমাপনী দিনে ছিল একাধিক অধিবেশন
শনিবার সমাপনী দিনে সকাল ৯টা থেকে শুরু হয় একাধিক অধিবেশন। ১৯ দিন ধরে যে মাঠে নবীপ্রেম, সীরাতের শিক্ষা ও ইসলামী জীবনদর্শনের আলোচনা হয়েছে, শেষ দিনেও সেই মাঠ ছিল মুসল্লিদের পদচারণায় মুখর।
সমাপনী অনুষ্ঠানে আলোচনা, খুৎবায়ে ছদর, সমাপনী বক্তব্য ও মিলাদ শরিফের পর অনুষ্ঠিত হয় আখেরি মোনাজাত।
মোনাজাতের সময় শাহ্ মনজিল সীরত ময়দান ও আশপাশের এলাকা লক্ষ লক্ষ মুসল্লির সম্মিলিত ‘আমিন, আল্লাহুম্মা আমিন’ ধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে।
এরপর সালাতুল ফজর আদায়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এবারের আয়োজন।
রাসূলের আদর্শ অনুসরণের আহ্বান
এতে বক্তারা ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে শান্তি, ন্যায়, ঐক্য ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠায় মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাদর্শ অনুসরণের আহ্বান জানান।
যুগশ্রেষ্ঠ আলেম হযরত মাওলানা হাফেজ আহমদ প্রকাশ শাহ্ সাহেব কেবলা চুনতী (রহ.) প্রবর্তিত এ ঐতিহাসিক মাহফিলের সমাপনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মাহফিল মোতাওয়াল্লী কমিটির সভাপতি আলহাজ্ব মাওলানা হাফিজুল ইসলাম আবুল কালাম আজাদ।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সাহারবিল আনোয়ারুল উলুম কামিল মাদ্রাসার সাবেক অধ্যক্ষ আলহাজ্ব মাওলানা রুহুল কুদ্দুস আনোয়ারী, আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রফেসর ড. মাওলানা আবু বকর রফিক আহমদ এবং চুনতী হাকিমিয়া কামিল মাদ্রাসার সাবেক অধ্যক্ষ আলহাজ্ব মাওলানা মাহমুদুল হক।
বিশেষ মেহমান হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব শাহজাহান চৌধুরী ও আলহাজ্ব নাজমুল মোস্তফা আমিন।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন চুনতী হাকিমিয়া কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা ফারুক হোসাইন।
সমাপনী বক্তব্যে মাহফিল মোতাওয়াল্লী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক শাহজাদা মাওলানা আব্দুল মালেক মুহাম্মদ ইবনে দিনার নাজাত ১৯ দিনের আয়োজনের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও সফল সমাপ্তির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
এ সময় তিনি সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। একই সঙ্গে সীরাতের এ ঐতিহাসিক আয়োজনকে আরও বিস্তৃত ও সুসংগঠিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
সমাপনী দিনে ‘হযরত মু’আয (রা.)-কে প্রদত্ত রাসূল (সা.)-এর ১০টি অসিয়ত’ বিষয়ে দরসে হাদিস পরিচালনা করেন বান্দরবান কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের খতিব আলহাজ্ব মাওলানা আলা উদ্দিন ইমামী।
‘বিদায় হজে রাসূল (সা.)-এর প্রদত্ত ভাষণের গুরুত্ব ও তাৎপর্য’ বিষয়ে আলোচনা করেন সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা আলহাজ্ব ড. মাওলানা আ.ফ.ম. খালেদ হোসাইন।
‘ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা’ বিষয়ে বক্তব্য দেন আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মাওলানা বি.এম. মুফিজুর রহমান আজহারী।
‘শান্তির সমাজ প্রতিষ্ঠায় মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ (সা.)’ বিষয়ে আলোচনা করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের প্রফেসর ড. মাওলানা আ.ক.ম. আবদুল কাদের।
‘ইসলামের দৃষ্টিতে ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা এবং অনৈক্যের কারণ ও পরিণতি’ বিষয়ে বক্তব্য দেন ঢাকার মুফতি মাওলানা আলী হাসান ওসামা।
বক্তারা বলেন, ইসলাম কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের নাম নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। রাসূল (সা.)-এর বিদায় হজের ভাষণে মানবিকতা, ন্যায়, সাম্য ও ঐক্যের যে শিক্ষা রয়েছে, তা অনুসরণ করলেই সমাজের বিভাজন, অশান্তি ও নৈতিক অবক্ষয় দূর করা সম্ভব।
এছাড়া ‘ইসলামের শ্রেষ্ঠত্বের প্রামাণ্য’, ‘কামিল মুরশিদের পরিচয় ও গুণাবলি’, ‘আল-কোরআন ও বিজ্ঞান’, ইবাদত ও নামাজের গুরুত্বসহ বিভিন্ন বিষয়ে দেশের বিশিষ্ট আলেম ও ইসলামি চিন্তাবিদরা আলোচনা করেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টানা ১৯ দিন ধরে এত বড় একটি আয়োজন পরিচালনা করা সহজ নয়। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে একই ধারায় চলে আসছে এই ব্যবস্থাপনা। মানুষের সংখ্যা ও মাহফিলের পরিধি বাড়লেও বন্ধ হয়নি আগতদের খাবারের আয়োজন।
এ কারণেই চুনতীর সীরত মাহফিল কেবল একটি নির্দিষ্ট এলাকার মানুষের আয়োজন হয়ে থাকেনি।
ধীরে ধীরে এটি দক্ষিণ চট্টগ্রামের সীমানা ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের কাছে পরিচিত একটি ঐতিহাসিক ধর্মীয় আয়োজন হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে।
শেষ দিনে সেই ঐতিহাসিক আয়োজনের সমাপ্তি ঘটে লক্ষ লক্ষ মুসল্লির সম্মিলিত ‘আমিন, আমিন’ ধ্বনি, দরুদ-সালাম ও মোনাজাতের মধ্য দিয়ে।











