দুই দিনে অনুমোদন ৩ শতাধিক
সাতকানিয়ায় ইউএনওর বদলির আগে নামজারির ‘হিড়িক’
মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন: বদলির আদেশের পর সাতকানিয়ায় শেষ কর্মদিবস ঘনিয়ে আসছে—এরই মধ্যে সহকারী কমিশনার (ভূমি) পদ শূন্য হওয়ায় সেই দায়িত্ব পান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান। দায়িত্ব পাওয়ার মাত্র দুই দিনের মধ্যে সাতকানিয়ার বিভিন্ন ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে পাঠানো তিন শতাধিক নামজারি মামলা অনুমোদনের অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, এসব নামজারি অনুমোদনকে কেন্দ্র করে প্রায় ৫ লাখ টাকার আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও সামনে এসেছে।
ভূমি অফিস-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, ২৬ ও ২৭ আগস্ট মাত্র দুই দিনে সাতকানিয়ার বিভিন্ন ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে পাঠানো তিন শতাধিক নামজারি ফাইল অনুমোদন করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এর মধ্যে কিছু ফাইল অফিস সময়ের বাইরে গভীর রাতে অনুমোদন দেওয়া হয়। এমনকি ভূমি অফিসে উপস্থিত না হয়ে সরকারি বাসভবনে বসেও ফাইল অনুমোদনের অভিযোগ উঠেছে ইউএনওর বিরুদ্ধে।
দুই দিনে এত বিপুলসংখ্যক নামজারি অনুমোদনের ঘটনায় এখন প্রশ্ন উঠেছে—কীভাবে এত ফাইলের তদন্ত, প্রতিবেদন, শুনানি ও প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই সম্পন্ন হলো? সাধারণ একজন ভূমিমালিককে একটি নামজারি সম্পন্ন করতে যেখানে দীর্ঘ সময় ভূমি অফিসে ঘুরতে হয়, সেখানে মাত্র দুই দিনে তিন শতাধিক মামলা নিষ্পত্তির বিষয়টি নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
তাঁদের প্রশ্ন, এতগুলো ফাইল কি আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল? যদি প্রস্তুতই থাকে, তাহলে এতদিন সেগুলো পড়ে ছিল কেন? আর মাত্র দুই দিনে শত শত ফাইলের প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া কীভাবে শেষ হলো?
২৫ আগস্ট ক্ষমতা, ২৭ আগস্ট শেষ কর্মদিবস
সাতকানিয়ার সহকারী কমিশনার (ভূমি) শামসুজ্জামান গত ১৬ আগস্ট বদলি হয়ে চলে যাওয়ার পর পদটি শূন্য হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইউএনও খোন্দকার মাহমুদুল হাসানকে সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে কাজ সম্পাদনের ক্ষমতা দেওয়া হয় ২৫ আগস্ট।
এর মাত্র দুই দিন পর, ২৭ আগস্ট ছিল তাঁর সাতকানিয়ায় শেষ কর্মদিবস। অর্থাৎ ভূমি-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ এই দায়িত্ব পাওয়ার পর কার্যত বুধবার ও বৃহস্পতিবার—এই দুই দিনই তাঁর হাতে ছিল।
সাতকানিয়া উপজেলা ভূমি অফিসের ভারপ্রাপ্ত নাজির পলাশ দাশ বলেন, “ইউএনও স্যার মঙ্গলবার, অর্থাৎ ২৫ আগস্ট আইডি পেয়েছিলেন। বৃহস্পতিবার ছিল তাঁর শেষ অফিস।”
ভূমি অফিস-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এই দুই দিনের মধ্যেই বিভিন্ন ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে পাঠানো বিপুলসংখ্যক নামজারি ফাইল অনুমোদন করা হয়।
বিভিন্ন ভূমি অফিসে অনুমোদনের হিড়িক
নামজারি অনুমোদনের বিষয়ে সাতকানিয়ার বিভিন্ন ইউনিয়ন ভূমি অফিসের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে একাধিক ফাইল অনুমোদনের তথ্য পাওয়া গেছে।
নামজারি কাজের সঙ্গে জড়িত এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “সদ্য বদলি হওয়া ইউএনও খোন্দকার মাহমুদুল হাসান আইডি পেয়ে গত দুই দিন তাঁর বাসায় নামজারি অনুমোদনের বাজার বসিয়েছেন। এটা সাতকানিয়ার ইতিহাসে রেকর্ড থাকবে।”
সাতকানিয়া সদর ভূমি অফিসের তহশিলদার কাজী ইমরুল কায়েস বলেন, “ইউএনও স্যার আনুমানিক ৬০/৭০টি নামজারি ফাইল অনুমোদন দিয়েছেন। রাতে দিয়েছেন, নাকি দিনে দিয়েছেন—সেটি আমি জানি না।”
বাজালিয়া ভূমি অফিসের তহশিলদার মোকাম্মেল হোসেন জানান, তাঁর অফিসে তেমন ফাইল জমা ছিল না। আনুমানিক ৩০টি ফাইল ইউএনও অনুমোদন দিয়েছেন।
তুলাতলী ভূমি অফিসের তহশিলদার হারেজ আহমদ বলেন, “আমি কোনো নামজারি করিনি, নামজারি করেন এসি ল্যান্ড।” গত দুই দিনে কতটি নামজারি হয়েছে—এ প্রশ্ন করা হলে তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
দেওদিঘী ভূমি অফিসের তহশিলদার সালাউদ্দিন বলেন, “বেশ কিছু অনুমোদন হয়েছে জেনেছি। কিন্তু কয়টা হয়েছে জানি না।”
বিভিন্ন ভূমি অফিসের কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যে সংখ্যার ভিন্নতা থাকলেও গত দুই দিনে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নামজারি অনুমোদনের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট সব ভূমি অফিসের সরকারি রেকর্ড যাচাই করা হলে প্রকৃত সংখ্যা আরও স্পষ্ট হবে।
রাতের আঁধারে বাসভবন থেকে ফাইল অনুমোদনের অভিযোগ
তথ্যানুসন্ধানে অভিযোগ উঠেছে, ২৬ ও ২৭ আগস্ট রাতের বেলায় ভূমি অফিসের কর্মকর্তাদের ডেকে এনে নামজারি ফাইলের কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। আরও অভিযোগ রয়েছে, ভূমি অফিসে উপস্থিত না হয়ে ইউএনও তাঁর সরকারি বাসভবনে বসে গভীর রাতে একের পর এক নামজারি ফাইলে অনুমোদন দেন।
তবে এই অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। যদি অফিস সময়ের বাইরে সরকারি বাসভবন থেকে ভূমি-সংক্রান্ত ফাইল অনুমোদনের ঘটনা সত্য হয়, তাহলে তা কীভাবে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে—তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দুই দিনে ৫ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ
তিন শতাধিক নামজারি অনুমোদনের এই কার্যক্রমকে ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে আরেকটি গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দুই দিনে বিপুলসংখ্যক নামজারি অনুমোদনকে কেন্দ্র করে প্রায় ৫ লাখ টাকার আর্থিক লেনদেন হয়েছে। প্রতিটি নামজারির জন্য ১ হাজার ৫শ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত নিয়েছেন।
সচেতন মহলের মতে, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে ২৫ থেকে ২৭ আগস্ট পর্যন্ত অনুমোদিত সব নামজারি মামলার তালিকা, আবেদনকারীর তথ্য, ফাইল অনুমোদনের সময়, সংশ্লিষ্ট তহশিলদারের প্রতিবেদন এবং ডিজিটাল রেকর্ড পরীক্ষা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের বিষয়টিও তদন্তের মাধ্যমে বের করা উচিত।
সাতকানিয়ায় সম্প্রতি সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করা একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “যদি মাত্র দুই দিনে অফিস সময়ের বাইরে শত শত নামজারি মামলা অনুমোদন দেওয়ার ঘটনা সঠিক হয়, তাহলে বিষয়টি অবশ্যই তদন্তের দাবি রাখে। কারণ এখানে যথেষ্ট অসঙ্গতি থাকার সম্ভাবনা দেখা যায়।”
তিন দফা বদলি, শেষ মুহূর্তে ভূমির দায়িত্ব
খোন্দকার মাহমুদুল হাসান ২০২৫ সালের ২৯ জুলাই সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন। দায়িত্ব পালনকালে তাঁকে একবার নয়, তিন দফায় বদলির আদেশ দেওয়া হয়।
প্রথম দফায় ১০ মার্চ তাঁকে সাতকানিয়া থেকে প্রত্যাহার করে পরবর্তী পদায়নের জন্য রংপুর বিভাগে ন্যস্ত করা হয়। এরপরও তিনি সাতকানিয়ায় দায়িত্ব পালন করেন।
দ্বিতীয় দফায় ২৩ এপ্রিল তাঁকে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার মহালছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে পদায়ন করা হয়। কিন্তু সেই আদেশের পরও তিনি সাতকানিয়ায় থেকে যান।
সর্বশেষ তৃতীয় দফায় ২৩ আগস্ট তাঁকে সাতকানিয়া থেকে প্রত্যাহার করে ঢাকা বিভাগে ন্যস্ত করা হয়। তিন দফা বদলির পর ২৭ আগস্ট ছিল তাঁর সাতকানিয়ায় শেষ কর্মদিবস।
আর বদলির এই শেষ পর্যায়েই ২৫ আগস্ট তিনি সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে কাজ সম্পাদনের ক্ষমতা পান। এরপর মাত্র দুই দিনে তিন শতাধিক নামজারি অনুমোদনের অভিযোগ এবং ৫ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
তদন্তেই বের হতে পারে প্রকৃত রহস্য
সচেতন মহলের দাবি, বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে ২৫ থেকে ২৭ আগস্ট পর্যন্ত অনুমোদিত সব নামজারি ফাইলের সংখ্যা, অনুমোদনের সময় ও স্থান, আবেদন ও শুনানির তারিখ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রতিবেদন যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
একই সঙ্গে অফিস সময়ের বাইরে কোনো ফাইল অনুমোদন করা হয়েছে কি না এবং সরকারি বাসভবন থেকে ভূমি-সংক্রান্ত নথি অনুমোদনের অভিযোগ সত্য কি না, তা ডিজিটাল রেকর্ডের মাধ্যমে যাচাই করার দাবি উঠেছে।
অর্থ লেনদেনের অভিযোগের বিষয়টিও তদন্তের আওতায় এনে সত্যতা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে খোন্দকার মাহমুদুল হাসানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর মোবাইল ফোনে সংযোগ পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
এখন প্রশ্ন—মাত্র দুই দিনে তিন শতাধিক নামজারি কীভাবে অনুমোদন হলো? ফাইলগুলো কি আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল, নাকি শেষ মুহূর্তে বিশেষ তৎপরতায় এগুলো নিষ্পত্তি করা হয়েছে? আর ৫ লাখ টাকা লেনদেনের যে অভিযোগ উঠেছে, তার সত্যতাই বা কতটুকু?
সরকারি নথি, ডিজিটাল রেকর্ড ও সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদই দিতে পারে এসব প্রশ্নের প্রকৃত উত্তর।











