লামায় পাহাড় নিধনের মহোৎসব: পাহাড়ের মাটি দিয়ে ৪০ ইটভাটার রমরমা ব্যবসা: নেপথ্যে মোক্তার-নাজু সিন্ডিকেট
মোহাম্মদ আবুল হাশেম লামা প্রতিনিধি
বান্দরবানের লামা উপজেলায় ইটভাটার মাটির চাহিদা মেটাতে বর্ষার মধ্যেই চলছে পাহাড় কাটার ভয়াবহ মহোৎসব। পরিবেশ আইন ও বিধিনিষেধের তোয়াক্কা না করে এক্সকাভেটর (বেকু) দিয়ে একের পর এক পাহাড় কেটে সাবাড় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কোথাও পাহাড়ের ঢাল কেটে খাড়া করে ফেলা হয়েছে, কোথাও আবার পাহাড়ের বুক চিরে তৈরি করা হয়েছে বিশাল গর্ত। পাহাড়ের নিচে জমা করা হচ্ছে বিপুল পরিমাণ মাটি, যা ইটভাটায় সরবরাহের জন্য প্রস্তুত রাখা হচ্ছে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। স্থানীয়দের অভিযোগ, ‘মোক্তার-নাজু’ নামে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের ছত্রচ্ছায়ায় দীর্ঘদিন ধরে এ কর্মকাণ্ড চলছে এবং পরিবেশ অধিদপ্তর ও প্রশাসনকে অসাধু উপায়ে ‘ম্যানেজ’ করে পাহাড় কাটার অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, লামা উপজেলায় প্রায় ৪০টি বা তারও বেশি ইটভাটা সক্রিয় রয়েছে। এসব ইটভাটার মাটির চাহিদা পূরণ করতে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পাহাড় কেটে মাটি সংগ্রহ করা হচ্ছে। বিশেষ করে ফাইতং ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় পাহাড় কাটার প্রবণতা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বর্ষার মধ্যেই বড় বড় পাহাড়ের ঢাল কেটে খাড়া করে ফেলা হয়েছে এবং পাহাড়ের নিচে মাটির বিশাল স্তূপ তৈরি করা হয়েছে। পরিবেশবাদীদের মতে, বর্ষা মৌসুমে এভাবে পাহাড় কাটার কারণে ভয়াবহ ভূমিধসের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। পাহাড়ের স্বাভাবিক ঢাল কেটে ফেলার ফলে মাটির স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়; গাছপালা ও শিকড়ের বন্ধন দুর্বল হয়ে যায় এবং অতিবৃষ্টিতে পাহাড়ের মাটি দ্রুত সরে গিয়ে আকস্মিক ভূমিধসের সৃষ্টি করতে পারে। এতে বসতবাড়ি, সড়ক, কৃষিজমি ও মানুষের জীবন মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। একই সঙ্গে পাহাড় কেটে মাটি সরিয়ে নেওয়ার কারণে বৃষ্টির পানির স্বাভাবিক প্রবাহও পরিবর্তিত হতে পারে। অতিরিক্ত মাটি ছড়া, খাল ও নিচু এলাকায় গিয়ে জমা হলে পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়ে পাহাড়ি ঢল, আকস্মিক বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। পরিবেশবাদীরা বলছেন, একটি পাহাড় কাটা মানে শুধু মাটি অপসারণ নয়; এর সঙ্গে ধ্বংস হচ্ছে পাহাড়ের প্রাকৃতিক প্রতিবেশব্যবস্থা। গাছপালা ও বনভূমি উজাড় হওয়ার পাশাপাশি পাখি, কীটপতঙ্গ, সরীসৃপ ও ক্ষুদ্র প্রাণীরা হারাচ্ছে তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল। ফলে স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
পাহাড়ের উপরিভাগের উর্বর মাটি সরিয়ে নেওয়ায় কৃষিজমির উৎপাদনক্ষমতাও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে ইটভাটার ধোঁয়া, ছাই ও ধুলাবালির কারণে আশপাশের পরিবেশ ও কৃষিজমিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, ফাইতং ইউনিয়নসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, লোকালয় ও বনাঞ্চলের কাছাকাছি ইটভাটা স্থাপন করা হয়েছে। এসব ভাটার ধোঁয়া ও ধুলাবালিতে স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে হচ্ছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, ভাটার আশপাশে কাশি, শ্বাসকষ্ট, চোখ জ্বালা ও অ্যালার্জির মতো সমস্যা বেড়েছে। পরিবেশবাদীদের মতে, দূষিত বায়ুর দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শ বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের জন্য উদ্বেগজনক। এ ছাড়া ইটভাটার ধোঁয়া ও রাসায়নিক নির্গমন মাটি, কৃষি, বন এবং জীববৈচিত্র্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বান্দরবান পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নুরুল হাসান সজীব বলেন, “আমি বান্দরবানে যোগদানের পর গত তিন মাসে অবৈধ ইটভাটা ও পাহাড় কাটার দায়ে ২৬ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ আদায় করেছি। এ সময়ে পাঁচটি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। অবৈধ ইটভাটা ও পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযান চলমান রয়েছে।” পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে অভিযান ও জরিমানার তথ্য থাকলেও স্থানীয়দের প্রশ্ন, জরিমানা ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনার পরও কীভাবে প্রকাশ্যে এক্সকাভেটর দিয়ে পাহাড় কাটা অব্যাহত রয়েছে। সচেতন মহলের অভিযোগ, শুধু জরিমানা আদায় করে পাহাড় রক্ষা সম্ভব নয়; পাহাড় কাটার মূল উৎস বন্ধ করতে হবে। কোথা থেকে মাটি কাটা হচ্ছে, কারা মাটি কিনছে, কোন ইটভাটায় তা যাচ্ছে, কারা পরিবহন করছে এবং এর পেছনে কোনো প্রভাবশালী মহলের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না—এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন পরিবেশবাদীরা। স্থানীয়দের অভিযোগে উঠে আসা ‘মোক্তার-নাজু’ সিন্ডিকেটের বিষয়েও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে। প্রশাসন বা পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অবৈধভাবে প্রভাবিত বা ‘ম্যানেজ’ করার অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকরা। আর অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে তদন্তের মাধ্যমে সেটিও পরিষ্কার করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। পরিবেশবাদীদের দাবি, লামার ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলো দ্রুত চিহ্নিত করে পাহাড় কাটা বন্ধ করতে হবে, অবৈধভাবে ব্যবহৃত এক্সকাভেটর জব্দ করতে হবে, পাহাড়ি মাটি পরিবহন বন্ধ করতে হবে এবং ইটভাটাগুলোর বৈধতা ও পরিবেশগত অনুমোদন নতুন করে যাচাই করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, লোকালয় ও বনাঞ্চলের কাছাকাছি স্থাপিত ইটভাটাগুলোর পরিবেশগত প্রভাবও জরুরি ভিত্তিতে পরীক্ষা করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
সচেতন মহলের মতে, পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি করে সাময়িক অর্থনৈতিক লাভ হলেও এর বিনিময়ে ধ্বংস হচ্ছে প্রকৃতি, বাড়ছে ভূমিধসের ঝুঁকি, নষ্ট হচ্ছে কৃষিজমি, হারিয়ে যাচ্ছে জীববৈচিত্র্য এবং হুমকির মুখে পড়ছে মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবন। একটি পাহাড় কেটে ফেলার পর সেটিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব। তাই বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা বা প্রাণহানির ঘটনা ঘটার আগে লামার পাহাড় রক্ষায় সরকারের সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন পরিবেশবাদী ও স্থানীয়রা। তাদের প্রশ্ন—আর কত পাহাড় কাটার পর থামবে এই ধ্বংসযজ্ঞ? আর কত বড় বিপর্যয় ঘটলে পাহাড় রক্ষায় স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে? এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে অতিবৃষ্টির কোনো এক মুহূর্তে পাহাড়ধসের ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসতে পারে—এমন আশঙ্কাই করছেন স্থানীয়রা।











