ইউএনও’র হঠাৎ অভিযানে দায়িত্বহীনতা ফাঁস
কাঞ্চনা ইউনিয়ন পরিষদ: সেবা নয়, গাফিলতির রাজত্ব
ইউনিয়ন পরিষদগুলো জনগণের সেবা প্রদানের কেন্দ্র। এখানে সাধারণ মানুষ আশা করে জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন থেকে শুরু করে নাগরিক সনদ, টিসিবির পণ্য বিতরণ কিংবা সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর সুবিধা পাওয়া পর্যন্ত সব ধরনের সহযোগিতা। কিন্তু বাস্তবে কী হচ্ছে? দিনের পর দিন এই পরিষদগুলোতে চলছে গাফিলতি আর দায়িত্বহীনতা। অভিযোগ আছে—জনগণ যখন পরিষদে যায়, তখন কর্মকর্তারা থাকেন না। এ যেন অবহেলার ঘাঁটি।
এ বাস্তবতার আড়ালে এতদিন সব কিছু চাপা থাকলেও সোমবার (২৫ আগস্ট) সকালে হঠাৎ করেই নাটকীয় মোড় নেয় সাতকানিয়ার প্রশাসনিক অঙ্গনে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান আকস্মিকভাবে তিনটি ইউনিয়ন পরিষদে প্রবেশ করেন—কাঞ্চনা, আমিলাইশ ও নলুয়া। আর তখনই বেরিয়ে আসে ভেতরের ভয়ঙ্কর চিত্র।
কাঞ্চনা ইউনিয়ন পরিষদে ইউএনও যখন হঠাৎ অফিসে প্রবেশ করেন, তখন দেখা নেই প্রশাসনিক কর্মকর্তার, দায়িত্বপ্রাপ্ত গ্রাম পুলিশও নেই। অনুপস্থিত কর্মকর্তা ও গ্রাম পুলিশের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করেন তিনি। নির্দেশ দেন, সাত দিনের মধ্যে কেন তারা দায়িত্বে অনুপস্থিত ছিলেন তার ব্যাখ্যা দিতে হবে।
স্থানীয়রা বলছেন, কাঞ্চনা ইউনিয়ন পরিষদে এ দৃশ্য নতুন কিছু নয়। বছরের পর বছর ধরে কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতি এবং দায়িত্বে গাফিলতি চলছে। জনগণ সেবা নিতে এসে ফিরে যায় খালি হাতে।
আমিলাইশ ইউনিয়ন পরিষদে কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকলেও ইউএনও’র হঠাৎ আগমনেই কাঁপন ধরে সবাইতে। ইউএনও এই ইউনিয়নের কার্যক্রম খুঁটিয়ে দেখেন। কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলেন।
এছাড়া নলুয়া ইউনিয়ন পরিষদে টিসিবি কার্যক্রম মনিটরিং করেন ইউএনও।
সাতকানিয়ার ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে গাফিলতি ও দুর্নীতি নতুন কিছু নয়। স্থানীয়রা জানায়, বছরের পর বছর ধরে এসব প্রতিষ্ঠানে চলে আসছে অনিয়ম।
অফিসে কর্মকর্তাদের উপস্থিতি অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। গ্রাম পুলিশ অনেক সময় দায়িত্ব পালন না করে ব্যক্তিগত কাজে ব্যস্ত থাকে। জন্মনিবন্ধন, নাগরিক সনদ বা ভাতা সংক্রান্ত কাজে দীর্ঘদিন ভোগান্তি পোহানো ছাড়া পাওয়া কিছুতেই সম্ভব হয় না।
টিসিবির পণ্য কিংবা সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর সুবিধা প্রকৃত দরিদ্ররা না পেয়ে সুবিধাভোগ করে প্রভাবশালীরা। রাজনৈতিক প্রভাবও এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে। ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ছত্রছায়ায় এসব অনিয়ম বেঁচে থাকে বছরের পর বছর। সাধারণ মানুষ অসহায়ের মতো তাকিয়ে থাকে।
জানতে চাইলে ইউএনও খোন্দকার মাহমুদুল হাসান দৈনিক নীলগিরিকে বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ জনগণের সেবা দেওয়ার প্রতিষ্ঠান। এখানে কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতি এক ধরনের অপরাধ। যারা দায়িত্বে গাফিলতি করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ইউএনও’র আকস্মিক অভিযান সাতকানিয়ার ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে দীর্ঘদিনের গাফিলতি ও অনিয়মের কফিনে পেরেক ঠুকে দিয়েছে। জনগণ নতুন করে আশার আলো দেখছে। জনগণের দাবি—ইউনিয়ন পরিষদ যেন সত্যিকারের সেবাকেন্দ্রে পরিণত হয়, যেখানে সাধারণ মানুষ দালালচক্রের কাছে জিম্মি হবে না, কর্মকর্তাদের গাফিলতির শিকার হবে না।
আজকের অভিযানে শুধু একটি দিনের বাস্তবতা নয়, বরং বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা অন্ধকার প্রশাসনিক বাস্তবতা উন্মোচিত হয়েছে।











