২৪’র জুলাই বিপ্লব
ইন্টারনেট শাটডাউনের সুযোগে ‘অপকর্ম সাম্রাজ্য’ গড়েছিলেন এসআই মোস্তাক
২০২৪ সালের কোটাবিরোধী আন্দোলনে সারা দেশে তখন তরুণদের চোখে আগুন, কণ্ঠে প্রতিবাদ। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে দেশের প্রান্তে প্রান্তে। কিন্তু সেই ঢেউ চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় যেন রূপ নেয় ভিন্ন রূপে—ত্রাস, আতঙ্ক আর থানা কেন্দ্রীক অর্থবাণিজ্যের নিকৃষ্ট নাটক। এই নাটকের মূল চরিত্র ছিলেন সাতকানিয়া থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) মোস্তাক আহমেদ (বিপি-৮৪১৩১৫৩১৫৭)।
অভিযোগ উঠেছে, সেসময় এসআই মোস্তাক আহমেদ তার পদের অপব্যবহার করে স্থানীয় জনগণের ওপর চালান নির্যাতন ও অর্থ আদায়ের এক নিষ্ঠুর প্রক্রিয়া। মানুষের চোখের ভাষা, মুখের ভঙ্গিমা বা রাজনীতিক পরিচয়ই হয়ে ওঠে ‘অপরাধের প্রমাণ’। তিনি চালান ‘গ্রেফতার বাণিজ্য’—একটি প্রক্রিয়া, যেখানে অপরাধ নয়, টাকা আদায়ই ছিল মূল লক্ষ্য।
কেরানীহাট মা ও শিশু হাসপাতালের ভাইস চেয়ারম্যান আজিজুল হক নিজের অভিজ্ঞতা স্মরণ করতে গিয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলেন, “আমার কোনো দোষ ছিল না। আন্দোলনের সময় একটি মানববন্ধনে উপস্থিত ছিলাম মাত্র। সেদিনই এসআই মোস্তাক আমাকে থানায় ধরে নিয়ে যায়। হুমকি দেয় ‘উস্কানি দেওয়ার’ অভিযোগে মামলা দেবে। আমি প্রাণভয়ে তার চাহিদা মতো ১ লাখ টাকা দিয়ে ছাড়া পাই।”
স্থানীয় ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান বলেন, “মোস্তাক ছিল আতঙ্কের প্রতীক। সরকার তখন দেশে ইন্টারনেট বন্ধ রেখেছিল, মিডিয়া কিছু জানত না। এই সুযোগে মোস্তাক নিরীহ মানুষকে ধরে থানায় নিয়ে যেত। আমাকে তো কোনো কারণ ছাড়াই তুলে নেয়, বলে—তুই আন্দোলনের ছেলেদের সাহায্য করিস। পরে ৮০ হাজার টাকা দিয়ে ছাড়া পাই।”
সাতকানিয়ার স্থানীয়দের অভিযোগ, এসআই মোস্তাক ও তার সহযোগী পুলিশের একটি চক্র বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় প্রহসনের এক ‘অপারেশন’ চালান। আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নয়, অপরাধের প্রমাণ নয়, শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে সাধারণ মানুষকে আটক করে থানায় নিয়ে গিয়ে আর্থিক দাবিনামা পাঠানো হতো পরিবারের কাছে। অনেকে বলছেন, “এই সময় সাতকানিয়ার থানা যেন হয়ে উঠেছিল আদায়ের দপ্তর। মুক্তির দরজা টাকা দিয়েই খোলা হতো।”
এক শিক্ষার্থী কাঁপা গলায় জানায়, “আমি এক বন্ধুর বাসায় যাচ্ছিলাম। মোড়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম মাত্র। এসআই মোস্তাক এসে বলে—‘তোদের চেহারা ভালো না’। এরপর আমাকে থানায় নিয়ে যায়। মা কেঁদে কেঁদে ২০ হাজার টাকা দিয়ে আমাকে ছাড়ায়।”
২০২৪ সালের আন্দোলন দমন করতে সরকার যখন দেশব্যাপী ইন্টারনেট বন্ধ রাখে, তখন সাতকানিয়ায় এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ‘তথ্য অন্ধকারের’ মধ্যে চালানো হয় এই চাঁদাবাজি। স্থানীয় সাংবাদিকরা বলেন, “তথ্যপ্রবাহ বন্ধ থাকায় মানুষের কণ্ঠ রোধ হয়ে যায়। মোস্তাকের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুললেই আরও ভয়ংকর পরিণতি হতো।”
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন— এসআই মোস্তাক আহমেদের মতো কর্মকর্তাদের অপকর্মের বিরুদ্ধে যদি দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আরেক মোস্তাক জন্ম নেবে আরও ভয়ংকর রূপে।
সাতকানিয়ার মানুষ এখন মুখে মুখে একটি প্রশ্নই করছেন— এসআই মোস্তাক কি অপরাধ করেও পার পাবে? নাকি তার বিচার হবে আইনের কাঠগড়ায়?
কারণ এই সাতকানিয়া একদিন চেয়েছিল পরিবর্তন, নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার। কিন্তু তাদের সেই চাওয়াকে পায়ের নিচে পিষে ফেলা হয়েছিল পুলিশের বুট দিয়ে। থানার দরজার ওপাশে কান্না লুকানো ছিল, বাইরে শান্তি।
সেসময় আটক হওয়া এক তরুণের মা বলেন, আমি কোনোদিন কল্পনাও করিনি আমার ছেলেকে পুলিশ ধরে নিয়ে টাকা চাইবে। আমি ভিক্ষে করে টাকা জোগাড় করেছি। সেই দুঃসহ রাতের ঘুম কে ফিরিয়ে দেবে?
সাতকানিয়ার সাবেক এসআই মোস্তাক আহমেদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো শুধু একজন পুলিশের অপকর্ম নয়, এটি একটি সময়ের দলিল—যেখানে নিরাপত্তার পোশাকে লুকিয়ে ছিল ভয়ংকর দুর্নীতি, লোভ আর ক্ষমতার অপব্যবহার।








