মা খুঁজছেন ছেলেকে, কিন্তু কেউ বলতে পারছে না কোথায় সে…
আগুনে ঝলসে গেল স্বপ্নগুলো: উত্তরায় বিমান দুর্ঘটনায় শিক্ষার্থীসহ নিহত ১৯
একটি স্বাভাবিক দুপুর ছিল সোমবার (২১ জুলাই)। রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ি মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে চলছিল নিয়মমাফিক ক্লাস। হঠাৎ বিকট শব্দে কেঁপে উঠল পুরো ভবন। মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল আগুন আর চিৎকার। দুপুর ১টা ৬ মিনিটে উড্ডয়নের কিছুক্ষণের মধ্যেই এফ-৭ বিজিআই মডেলের প্রশিক্ষণ বিমানটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিধ্বস্ত হয় উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের মাঠে। মুহূর্তেই ধ্বংসযজ্ঞ নেমে আসে আশপাশে। বিমানটি আছড়ে পড়ে স্কুলের একটি ভবনে, আর সেখানেই ছুটির অপেক্ষায় থাকা শিক্ষার্থীদের জীবনে নেমে আসে ভয়াবহ বিভীষিকা।
এই ভয়াবহ ঘটনায় সন্ধ্যায় রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত অন্তত ১৯ জনের প্রাণহানির কথা নিশ্চিত করেছেন
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মিডিয়া সেলের সিনিয়র স্টাফ অফিসার মো. শাহজাহান শিকদার।
তিনি জানান, ৯টি ইউনিট ও ৬টি অ্যাম্বুলেন্স কাজ করছে। উদ্ধার কাজ এখনো চলমান আছে।
ভয়াবহ দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ১৭০ জনের বেশি, যাদের অনেকেই শিশু—স্কুলের শিক্ষার্থী। দগ্ধদের কেউ ক্লাসে বসা ছিল, কেউ করিডোরে বন্ধুদের সঙ্গে হাসছিল, কেউ হয়তো খাতা খুলে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এখন তারা কেউ হাসপাতালের বিছানায়, কেউ নিখোঁজ… আর কেউ আর কখনো ফিরবে না।
একজন মায়ের কান্না:
ছেলেটা সকালে স্কুলে যেতে যেতে বলছিল, ‘মা, আজ স্যার নতুন গল্প পড়াবেন’। সেই গল্প সে আর শুনল না… এখন আমি হাসপাতালের বারান্দায় তার নাম খুঁজে ফিরি।
—নাজমা বেগম, নিখোঁজ শিক্ষার্থী রাহির মা
একজন শিক্ষকের শোক:
“তিনজন ছাত্রের খোঁজ নেই। ক্লাসের ছেলেগুলো আগুনের ধোঁয়ায় ঢেকে গিয়েছিল। আমি একজন শিক্ষক, কিন্তু আজ নিজেকে বড় অসহায় লাগছে।”
—রেজাউল করিম, শিক্ষক, মাইলস্টোন স্কুল
ফায়ার সার্ভিসের বর্ণনা:
“আমরা যখন ভবনে পৌঁছাই, তখন চারদিকে শুধু ধোঁয়া, আগুন আর মানুষের কান্না। ছোট ছোট জুতাগুলো পড়ে ছিল ছড়িয়ে ছিটিয়ে—এমন দৃশ্য কোনো মানুষ ভুলতে পারে না।”
—আবদুল মালেক, ফায়ার সার্ভিস কর্মী
হাসপাতালেই নীরবতা:
দগ্ধদের মধ্যে অনেকের অবস্থা গুরুতর। তারা চিকিৎসাধীন রয়েছেন জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউট ও ঢাকা মেডিকেল কলেজে। ডাক্তাররা বলছেন, এখনো মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন অনেকে। যারা বেঁচে গেছেন, তাদের শরীরে আগুনের দাগ থাকবে সারাজীবন, আর মনে থাকবে এই ভয়াল দিনের ক্ষত।
দগ্ধদের মধ্যে রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ৩৬ জনের পরিচয় শনাক্ত। জাতীয় বার্নে দগ্ধরা হলেন— ১.শামীম ইউসুফ (১৪) ২. মাহিন(১৫) ৩. আবিদ(১৭) ৪. রফি বড়ুয়া(২১) ৫. সায়েম (১২), ৬.সায়েম ইউসুফ (১৪), ৭. মুনতাহা(১১), ৮. নাফি (১০), ৯. মেহেরিন(১২), ১০.আয়মান(১০), ১১. জায়েনা (১৩), ১২.ইমন(১৭), ১৩. রোহান(১৪), ১৪.আবিদ(০৯), ১৫.আশরাফ(৩৭), ১৬.ইউশা(১১), ১৭.পায়েল(১২) ১৮.আলবেরা (১০), ১৯.তাসমিয়া(১৫), ২০.মাহিয়া (১৩), ২১.অয়ন(১৪), ২২.ফয়াজ(১৪), ২৩.মাসুমা(৩৮), ২৪. মাহাতা(১৪), ২৫.শামীম (১৭), ২৬.জাকির(৫৫), ২৭.নিলয়(১৪), ২৮.সামিয়া( ১৪), ২৯. আরিয়ান (১২) ৩০. তৌফিক (১৩), ৩১. নূসরাত (১৩), ৩২.তানভীর আহমেদ(১৩) (নিহত) ঢাকা মেডিকেলে দগ্ধ চারজন: তারা হলেন- রাইয়ান (১৪), জুনায়েদ (১১) (নিহত), জারিফ(১২), সবুজা বেগম (৪০)।
বিমান বিধ্বস্ত হয়ে হতাহতের ঘটনায় আগামীকাল মঙ্গলবার একদিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। সোমবার প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে এ তথ্য জানানো হয়।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দেশের সকল সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে। পাশাপাশি সকল সরকারি, বেসরকারি ভবন ও বিদেশে বাংলাদেশি মিশনেও জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে। এছাড়া আহত-নিহতদের জন্য দেশের সকল ধর্মীয় উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হবে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় শোক জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সোমবার প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক শোক বার্তায় বিষয়টি জানানো হয়।
বার্তায় প্রধান উপদেষ্টা বলেন, রাজধানীর দিয়াবাড়ি এলাকায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর এফ-৭ বিজেআই প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্তে হতাহতের ঘটনায় আমি গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করছি। এই দুর্ঘটনায় বিমানসেনা ও মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষক-কর্মচারীসহ অন্যান্যদের যে ক্ষতি হয়েছে তা অপূরণীয়। জাতির জন্য এটি একটি গভীর বেদনার ক্ষণ।










