পুরান ঢাকায় ভাঙারি ব্যবসায়ী খুন
লাশের ওপর লাফিয়ে ঘাতকদের নৃশংস উল্লাস
রাজধানীর পুরান ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতালের পাশে নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন সোহাগ নামে এক ভাঙারি ব্যবসায়ী। ঘটনার ভয়াবহতা এতটাই অমানবিক ছিল যে, হত্যার পর লাশের ওপর লাফিয়ে উল্লাস প্রকাশ করে ঘাতকরা। এই বিভৎস দৃশ্য ধরা পড়ে সিসিটিভি ক্যামেরায়।
নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিবরণ
ঘটনাটি ঘটে বুধবার (৯ জুলাই) সন্ধ্যা ৬টার দিকে মিটফোর্ড হাসপাতালের ৩ নম্বর ফটকের সামনে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, দুই তরুণ টেনে-হিঁচড়ে এক রক্তাক্ত, প্রায় বিবস্ত্র দেহকে হাসপাতালের ফটকের ভেতর থেকে বাইরে এনে মারধর করতে থাকে। একজন লাশের বুকের ওপর লাফায়, আরেকজন লাথি মারেন মাথায়। রাস্তায় উপস্থিত জনতা হতবিহ্বল হলেও কেউ সাহায্যে এগিয়ে আসেনি।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, শুরুতে সোহাগকে মারধর করে হাসপাতালের ভেতরে নেওয়া হয়। তখন তিনি বাঁচার জন্য পুলিশের সাহায্য চাওয়ার চেষ্টা করেন। এক পর্যায়ে ইট-পাথরের আঘাতে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।
ব্যবসায়িক বিরোধে হত্যার অভিযোগ
নিহত সোহাগ (৪২) পুরান ঢাকার রজনী বোস লেনে ‘সোহানা মেটাল’ নামে ভাঙারির ব্যবসা করতেন। তার গ্রামের বাড়ি বরগুনা সদরে। তিনি কেরানীগঞ্জের কদমতলী মডেল টাউনে পরিবারসহ বসবাস করতেন। স্ত্রী লাকী বেগম, ১৪ বছর বয়সী মেয়ে সোহানা ও ১১ বছরের ছেলে সোহানকে নিয়ে তার সংসার।
পরিবারের অভিযোগ, স্থানীয় যুবদল নেতা পরিচয়ধারী মহিন ও তার সহযোগীরা দীর্ঘদিন ধরে সোহাগের ব্যবসায় ভাগ চেয়ে আসছিল। সোহাগ রাজি না হওয়ায় তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয় এবং হত্যার আগের দিন তার গুদামে গুলিও চালানো হয়। এরপর ‘মীমাংসা’র কথা বলে ডেকে নিয়ে তাকে পরিকল্পিতভাবে খুন করা হয়।
গ্রেপ্তার ও মামলা
পুলিশ ইতিমধ্যে ঘটনার সঙ্গে জড়িত অভিযোগে মাহমুদুল হাসান মহিন ও তারেক রহমান রবিনকে গ্রেপ্তার করেছে। রবিনের কাছ থেকে একটি পিস্তল উদ্ধার করে অস্ত্র আইনে পৃথক মামলাও করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডে ১৯ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও ১৫–২০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা দায়ের করেন নিহতের বোন মঞ্জুয়ারা বেগম।
এজাহারে বলা হয়েছে, ব্যবসায়িক বিরোধ এবং এলাকা থেকে উৎখাতের উদ্দেশ্যে সোহাগকে গুদাম থেকে টেনে বের করে রড, লাঠি, সিমেন্টের ব্লক দিয়ে মারধর করা হয়। পরে তাকে বিবস্ত্র করে ফেলে ড্রেনের পাশে ফেলে দেওয়া হয় এবং মৃত্যুর পর লাশ রাস্তায় এনে নির্যাতন চালানো হয়।
আসামিদের নাম
মহিন ও রবিন ছাড়াও মামলার এজাহারে নাম রয়েছে: সারোয়ার হোসেন টিটু, ছোট মনির, আলমগীর, লম্বা মনির, মো. নান্নু, সজীব, রিয়াদ, টিটন গাজী, রাজীব, সাবা করিম লাকী, স্বেচ্ছাসেবক কালু, রজব আলী পিন্টু, সিরাজুল ইসলাম, মিজান, অপু দাস, হিম্মত আলী ও আনিসুর রহমান হাওলাদার।
রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া
পুরান ঢাকার ৩০ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আবদুল বারেক জানান, নিহত সোহাগ এবং গ্রেপ্তার মহিন একসময় যুবদলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে শুনেছেন, তবে তারা বর্তমানে দলের কোনো কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন না।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অপারেশন্স) এস এন নজরুল ইসলাম বলেন, “এমন বীভৎসতা আগে দেখিনি। তরুণদের একাংশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। সমাজে শৃঙ্খলা না থাকলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। রক্তাক্ত লাশের ওপর যা ঘটেছে, তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।”










