চকরিয়ায় এক পরিবারের পাঁচ স্বপ্ন নিভে গেল একসঙ্গে
কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চকরিয়ার ফাঁসিয়াখালী এলাকায় বুধবার সকালটা ছিল অন্য দিনের মতোই। সূর্য উঠেছিল শান্তভাবে, মানুষ ছুটছিল কাজের দিকে। কিন্তু সকাল ৯টার কিছু পরেই হাঁসের দিঘি সেনা ক্যাম্পের দক্ষিণে এক মুহূর্তেই বদলে গেল সবকিছু। এক পরিবারের পাঁচজনের জীবন থেমে গেল একসঙ্গে—একটি শিশু, চারজন নারী, আর তাদের হাসি-আনন্দের সমস্ত গল্প শেষ হয়ে গেল সড়কের ধুলায়।
সেই সময় চট্টগ্রামমুখী মারছা পরিবহণের একটি বাস মুখোমুখি ধাক্কা খায় কক্সবাজারগামী একটি মাইক্রোবাসের সঙ্গে। বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে চারপাশ। স্থানীয়রা ছুটে যান ঘটনাস্থলে—দেখেন, মাইক্রোবাসটি দুমড়েমুচড়ে গেছে, ভেতরে নিথর পড়ে আছে এক পরিবার। কেউ কেউ তখনও শেষ নিঃশ্বাস নিচ্ছিলেন।
নিহতরা হলেন, রুমি বেগম (৬৫), রিজওয়ানা মজুমদার শিল্পী (৫৫), ফারজানা মজুমদার লিজা (২৮), কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমবিএ শিক্ষার্থী সাদিয়া পাটোয়ারী (২৩) এবং চট্টগ্রাম বিশ্বিবদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ছাত্রী ফারজানা মজুমদার (২৪)।
আহতরা হলেন, উদয় পাটোয়ারী, সামাদ পাটোয়ারী, শাহেদ মজুমদার লিশান ও মাইক্রোবাস চালক আমিনুল হক।
উদয় পাটোয়ারী (৪৩) কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম পৌরসভার চান্দিশকরা গ্রামের বাসিন্দা। চাকরি করেন মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সে। তিনি ঢাকার উত্তরায় স্বপরিবারে থাকেন। মঙ্গলবার সকলেই মিলে কক্সবাজারে বেড়াতে যাচ্ছিলেন। হতাহতরা সকলেই আত্মীয়।
মালুমঘাট হাইওয়ে থানার ওসি মেহেদী হাসান জানান, “বাস ও মাইক্রোবাসের সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই পাঁচজন মারা গেছেন। আহত দুজনকে চকরিয়ার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আমরা দুটি গাড়িই জব্দ করেছি, তবে চালকেরা দুর্ঘটনার পর পালিয়ে গেছে।”
নিহতদের ছিন্নভিন্ন ব্যাগ, শিশুর ভাঙা খেলনা, আর নারীদের ছেঁড়া শাড়ির অংশ যেন গল্প বলে যাচ্ছিল—তারা কোথাও যাচ্ছিলেন, হয়তো আনন্দ ভ্রমণে, হয়তো কোনো আত্মীয়ের বাড়িতে। কিন্তু পথ তাদের পৌঁছে দিল মৃত্যুর দুয়ারে।
স্থানীয়দের কণ্ঠে ক্ষোভ ও হাহাকার—“এই জায়গাটায় গতি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা না থাকায় বারবার দুর্ঘটনা ঘটছে,” বলেন এক দোকানদার। “আমরা বহুবার বলেছি, এখানে স্পিডব্রেকার দরকার, সাইনবোর্ড দরকার। কিন্তু কেউ শোনে না।”
দুর্ঘটনার পর কিছু সময়ের জন্য মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। চারদিকে শুধু সাইরেনের শব্দ, আর শোকে নিস্তব্ধ মুখগুলো। পরে পুলিশ এসে যান চলাচল স্বাভাবিক করে, কিন্তু যে পাঁচটি প্রাণ চলে গেল—তাদের আর ফেরানো যাবে না।
সকালের সেই মেঘলা আকাশ তখনো ছিল, কিন্তু চকরিয়ার আকাশে ঝুলে ছিল এক অজানা বিষণ্ণতা। এক পরিবারের স্বপ্ন, ভালোবাসা আর হাসির গল্প মিলিয়ে গেল সড়কের কালো দাগে।
উল্লেখ্য, ২০২২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি একই উপজেলার মালুমঘাট বাজার এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের ছয় ভাই মারা যান।











