কাউন্সিলর মিন্টু কবরেও আসামি!
ছাত্র জনতার অভ্যুত্থানের ১৩ মাস পর ১৮১ জনের বিরুদ্ধে নালিশী মামলার আবেদন পড়েছে চট্টগ্রামের একটি আদালতে। এতে আসামি করা হয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, এমপি, কাউন্সিলর, ব্যবসায়ী, সেনা-পুলিশ কর্তা, নারী কাউন্সিলরদের। আসামির তালিকায় আছেন ২০২১ সালে মারা যাওয়া চট্টগ্রামের সাবেক কাউন্সিলর সাইয়েদ গোলাম হায়দার মিন্টুও। তিনি ১৬নং চকবাজার ওয়ার্ডের সাতবারের নির্বাচিত কাউন্সিলর ছিলেন।
সোমবার, ১ সেপ্টেম্বর সকালে চট্টগ্রামের মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. আবু বকর সিদ্দিকের আদালতে এই নালিশী মামলার আবেদন করেন একজন ছাত্র। আদালত পুলিশ ব্যুরো ‘অব ইনভেস্টিগেশন’ (পিবিআই) চট্টগ্রাম মেট্রো শাখাকে তদন্তের আদেশ দিয়েছেন।
মামলার আবেদনে জনপ্রিয় কাউন্সিলর
মামলার আবেদনে দেখা যায়, ১৮১ জনের মধ্যে ১৫০তম নম্বরে নাম রয়েছে সাবেক কাউন্সিলর মিন্টুর। তার নামের পরেই লেখা হয়েছে, ‘চট্টগ্রাম নিউমার্কেট নুরুল্লাহ হত্যা মামলায় সরাসরি জড়িত।’ অথচ ২০২১ সালের ১৮ মার্চ মারা যান চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ১৬ নম্বর চকবাজার ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর সাইয়েদ গোলাম হায়দার মিন্টু। এলাকায় তিনি বেশ জনপ্রিয় ছিলেন। তাঁকে হজরত মোল্লা মিছকিন শাহের (র) দরগাহ কবরস্থানে দাফন করা হয়।
এছাড়াও মামলার আবেদনকারী একেএম নুরুল্লাহ জীবিত। কাউন্সিলর মিন্টুর নামের পাশে লেখা হয়েছে, ‘নুরুল্লাহ হত্যা মামলায় সরাসরি জড়িত।’ অথচ আবেদনে ধারা উল্লেখ করা হয়েছে হত্যাচেষ্টা মামলা ৩০৭সহ আরো কয়েকটি ধারা যুক্ত করা হয়।
বাদী পক্ষের আইনজীবী তাসনিম আক্তার নিশাতের কাছে এসব বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সিনিয়র আইনজীবী আবু বক্করের সঙ্গে কথা বলতে বলেন।
আইনজীবী আবু বক্করের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি পতাকানিউজকে বলেন, ‘মামলার ভিত্তি থাকায় আমি মামলা করে দিয়েছি। আসামিদের বিষয়ে তথ্য নিয়েছেন বাদী নিজেই। তার সঙ্গে কথা বললে বিষয়টি নিশ্চিত হতে পারবেন।’
নিশ্চিত জেনে মামলা
এদিকে নিরীহ-নিরপরাধ ব্যক্তিদের মামলায় অন্তর্ভুক্ত না করতে আসামিদের প্রত্যেকের পরিচয় বাদী নিজে নিশ্চিত হয়ে মামলা করেছেন বলে উল্লেখ করা হয় এজাহারে। এর ফলে মামলা করতে দেরি হয়েছে বলেও জানানো হয়। তবে নিশ্চিত হওয়ার পরও কেন মৃত ব্যক্তির নামে এসেছে জানতে চাইলে মামলার বাদী এ কে এম নুরুল্লাহ প্রতিবেদকের কাছে জানতে চান কত নম্বর আসামি মার গেছে।
পরে তিনি বলেন, ‘মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে তিনি বিষয়টি জানিয়ে দেবেন। এছাড়া তিনি মামলার বিষয়টি গোপন রাখতে চাইছেন বলেও জানান।’ কিন্তু কেন গোপন রাখতে চান জানতে চাইলে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রেফারেন্স দিয়ে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ এখনো মাঠে আছে। তাদের ভয়ে তিনি মামলার বিষয়টি গোপন রাখতে চান। এছাড়া ৮০ শতাংশ অভিযুক্ত আটক হলে তিনি নিজেকে সেফ ভাববেন।’
এ কে এম নুরুল্লাহ চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সায়েন্সেস অফ হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ছাত্র। তিনি কিশোরগঞ্জ জেলার সদর থানার বগাদিয়া বিন্নাগাঁও গ্রামের মো. রতন মিয়ার ছেলে। তিনি বর্তমানে সীতাকুণ্ডের সোনাইছড়ি এলাকায় থাকেন।
মামলার অভিযোগে বাদী উল্লেখ করেন, ৪ আগস্ট নিউমার্কেটে নুরুল্লাহ গুলিবিদ্ধ হন। সেসময় তিনিসহ ১৫-২০ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। পরে নগরের একটি প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। সেদিন রাতে অপারশেন করে তার দুই পা থেকে ৩টি রাবার বুলেট ও ১৩টি লিথ্যাল বুলেট বের করা হয়। মামলায় নিরীহ, নিরপরাধী ব্যক্তি যেন অন্তর্ভুক্ত না হয় সেজন্য মামলা রুজুতে কালক্ষেপণ হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
মামলার অভিযোগে আরও দাবি করা হয়, দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলার আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের চট্টগ্রামে এনে ৩৬ দিনব্যাপী পুলিশ ও ভারতীয় বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হয়ে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে। শনাক্তকরণ সহজ করতে তারা মোবাইল সিম নিজ এলাকায় রেখে চট্টগ্রামে এসেছিলো। এছাড়া প্রত্যেক আসামির নাম বিশ্বস্ত সূত্র এবং বাদী নিজে যাচাই করেছেন।
এজাহারে আরো যারা
মামলার উল্লেখযোগ্য আসামিরা হলেন, ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান জাবেদ, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান, সাবেক আইসিটি মন্ত্রী জোনায়েদ আহমেদ পলক, আওয়ামী লীগের সাবেক দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া, সাবেক সিএমপি কমিশনার সাইফুল ইসলাম, সাবেক চসিক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন, রেজাউল করিম, শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের কর্ণধার মো. সাইফুল আলম, শেখ হাসিনার নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা মেজর (অব) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান, সাবেক সেনা কর্মকর্তা জেনারেল মুজিবুর রহমান, সাবেক সিইসি নুরুল হুদা, কাজী হাবিবুল আউয়াল, সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক, চবকের পরিচালক (পরিবহন) এনামুল করিম।
সাবেক সংসদ সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন, নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী, মাহবুবুর রহমান রুহেল, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, আবদুর রহমান বদি, দিদারুল আলম, আশেক উল্ল্যাহ রফিক, আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, সাইমুম সরওয়ার কমল, এসএম আল মামুন, এম এ লতিফ, মহিউদ্দিন বাচ্চু, আবু রেজা মো. নেজামুদ্দিন নদভী, ফজলে করিম চৌধুরী, মুজিবুর রহমান এবং মোস্তাফিজুর রহমান।
চসিকের সাবেক কাউন্সিলরদের মধ্যে রয়েছেন, পুলক খাস্তগীর, হাজি নুরুল হক, মোরশেদ আলী, হাসান মুরাদ বিপ্লব, জহরলাল হাজারী, আতাউল্লাহ চৌধুরী, গোলাম মো. জোবায়ের, নজরুল বাহাদুর, নাজমুল হক ডিউক, শফিউল আজিম, নুরুল আমীন মামুন, হোসেন হিরণ, আব্দুর রহমান, আবুল হাসনাত বেলাল, এম আশরাফুল আলম, সলিমুল্লাহ বাচ্চু, শৈবাল দাশ সুমন, হাসান মাহমুদ হাসনী, নুরুল আলম, হারুনুর রশীদ, শহীদুল আলম, গিয়াস উদ্দিন ও মোরশেদ আলম।
গত বছরের ৪ আগস্ট নগরের কোতোয়ালী থানায় দায়িত্বরত ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, পরিদর্শক (তদন্ত), সকল উপ-পরিদর্শক, সহকারী উপ-পরিদর্শককসহ ৩০ থেকে ৪০ জন অজ্ঞাত পুলিশ সদস্য এবং আওয়ামী লীগ ও দলটির অঙ্গসহযোগী সংগঠনের অজ্ঞাত আরও ৫০ থেকে ৬০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
সূত্র: পতাকা নিউজ











