সাতকানিয়ায় পার্টনার ফিল্ড স্কুল কংগ্রেস
‘ফিল্ড স্কুল শুধু চাষ শেখায় না, নেতৃত্বও গড়ে’
একটা সময় ছিল, যখন কৃষক মানেই মাঠে লাঙল-হালের সঙ্গে যুদ্ধ করে বাঁচার লড়াই। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন সেই কৃষকই হাতে নিচ্ছেন মাটি পরীক্ষার কিট, পকেটে রাখছেন বাজার বিশ্লেষণের অ্যাপ, আর কণ্ঠে উচ্চারণ করছেন ‘জলবায়ু সহনশীল প্রযুক্তি’র মতো শব্দ।
মঙ্গলবার (২৪ জুন) সাতকানিয়ার এরাবিয়ান কনভেনশন হলে আয়োজিত ‘পার্টনার ফিল্ড স্কুল কংগ্রেস’ ছিল তারই বাস্তব প্রমাণ।
এই কংগ্রেসটি ছিল ‘প্রোগ্রাম অন এগ্রিকালচারাল এন্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন, এন্টারপ্রেনরশিপ এন্ড রেসিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ (পার্টনার)’ প্রোগ্রামের আওতায় আয়োজিত অন্যতম ব্যতিক্রমী ও তাৎপর্যপূর্ণ এক প্ল্যাটফর্ম, যেখানে মাঠ পর্যায়ের কৃষক-কৃষাণীরা কেবল অংশগ্রহণকারী হিসেবেই থাকেননি— ছিলেন নেতৃত্বের ভূমিকায়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাতকানিয়া উপজেলা কার্যালয় এই আয়োজনের মূল দায়িত্বে থাকলেও কংগ্রেসটি রূপ নেয় এক ধরনের উৎসব-সম্মেলনে।
এতে অংশ নেয় সাতকানিয়ার বিভিন্ন এলাকার কৃষক-কৃষাণী, স্কুলভিত্তিক কৃষি ক্লাবের সদস্য, কৃষি কর্মকর্তাসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সাংবাদিকরা।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে পার্টনার প্রকল্পের সিনিয়র মনিটরিং অফিসার কৃষিবিদ আবু কাউছার মো. সারোয়ার বলেন, ‘এই ফিল্ড স্কুল শুধু মাঠে কাজ শেখায় না, মাথায় নেতৃত্বের ভাবনা ঢুকিয়ে দেয়। একজন কৃষক কীভাবে জলবায়ু পরিবর্তন বুঝে চাষাবাদ করবে, কীভাবে নিজের বাজার তৈরি করবে, সেটাও এই স্কুল শেখায়।’
অনুষ্ঠানে মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন চট্টগ্রাম জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) ওমর ফারুক। আলোচনায় কৃষক-কৃষাণীরা ফিল্ড স্কুলের মাধ্যমে শেখা তাদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন।
কালিয়াইশ এলাকার কৃষক সালাহ উদ্দিন কাদের বলেন, ‘আগে আমরা সনাতন পদ্ধতিতে চাষ করতাম। ফিল্ড স্কুলে অংশ নেওয়ার পর এখন আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করছি। এতে খরচ কমেছে, উৎপাদনও বেড়েছে।’
ধর্মপুর এলাকার কৃষাণী রওশন আক্তার বলেন, ‘ফিল্ড স্কুলে এসে আমি বিষমুক্ত সবজি চাষ সম্পর্কে শিখেছি। এখন নিজের পরিবারের জন্য নিরাপদ সবজি উৎপাদন করতে পারছি।’
বাজালিয়া এলাকার কৃষাণী রেশমা আক্তার পপি বলেন, ‘ফিল্ড স্কুল থেকে আমি পুষ্টি বিষয়ে নানা ধরনের জ্ঞান পেয়েছি। বিশেষ করে কোন খাবার কীভাবে খেলে পুষ্টি বজায় থাকে, সেটা জেনেছি। এখন পরিবারের সদস্যদের খাবার পরিকল্পনাও সেভাবে করি।’
পার্টানার প্রোগ্রামটি মূলত তিনটি বিষয়কে কেন্দ্রে রেখে গড়ে তোলা— ১. পুষ্টিমুখী কৃষি উৎপাদন ২. উদ্যোক্তা উন্নয়ন ৩. জলবায়ু সহনশীলতা ও স্থায়িত্ব।
এর আওতায় প্রতি ইউনিয়নে গড়ে তোলা হচ্ছে “ফিল্ড স্কুল” যেখানে স্থানীয় কৃষকদের হাতে-কলমে শেখানো হচ্ছে কীভাবে আধুনিক, লাভজনক ও টেকসই কৃষি করা যায়।
সাতকানিয়ার কৃষি কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান বলেন, এই প্রোগ্রামে আমরা শুধু ধান-গম শেখাচ্ছি না। শেখাচ্ছি কীভাবে পুষ্টিকর সবজি, ফলমূল, হাঁস-মুরগির খামার চালিয়ে নিজের পরিবারের পুষ্টি নিশ্চিত করতে হয়। পাশাপাশি কীভাবে সেটাকে ব্যবসায় রূপান্তর করতে হয়।
পার্টনার প্রোগ্রামের একটি বৈপ্লবিক দিক হলো কৃষকদের হাতে প্রযুক্তি তুলে দেওয়া। কংগ্রেসে দেখা যায়, নারী ও পুরুষ কৃষকেরা তাঁদের মোবাইলে অ্যাপ ব্যবহার করে আবহাওয়া, সার দর, রোগবালাই সম্পর্কে তথ্য নিচ্ছেন।
কংগ্রেসে ছিল একটি ছোট “জ্ঞান মেলা” অংশ। সেখানে ফিল্ড স্কুলগুলোর পক্ষ থেকে চিত্র-প্রদর্শনী, ভিডিও উপস্থাপনা ও বাস্তব জীবনের সাফল্যের গল্প তুলে ধরা হয়।
এই কংগ্রেসে সবচেয়ে শক্তিশালী বার্তাগুলোর একটি আসে নারী কৃষকদের মুখ থেকে। তাঁরা জানান, ফিল্ড স্কুলে গিয়ে তাঁরা শুধু প্রযুক্তি নয়, আত্মবিশ্বাস অর্জন করেছেন।
পরিশেষে কংগ্রেসের সমাপ্তি ঘোষণা করেন অনুষ্ঠানের সভাপতি সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিল্টন বিশ্বাস। তিনি বলেন, ‘এই কংগ্রেস আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে— কৃষি উন্নয়নের সবচেয়ে বড় শক্তি মাঠের মানুষ। আমরা চাই প্রতিটি ইউনিয়নে এমন ফিল্ড স্কুল থাকুক, যেখানে কেবল কৃষির জ্ঞান নয়, নেতৃত্ব, পুষ্টি, প্রযুক্তি এবং উদ্যোক্তাসুলভ মানসিকতা গড়ে তোলা হবে। এটাই টেকসই উন্নয়নের পথ।’
উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ আয়ুব আলীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা বিত্তম কুমার সরকার, সমাজসেবা কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসাইন এবং উপসহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা শম্ভু নাথ দেবসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।








