রুমায় বিহারে নাম ভাঙ্গিয়ে হেডম্যান বিরুদ্ধে জায়গায় দখলে অভিযোগ
উবাসিং মার্মা,রুমা প্রতিনিধি
বান্দরবানের রুমায় ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে সাধারণ মানুষের জমি দখলের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে ৩৫৩ নং কোলাদি মৌজার হেডম্যান শৈচিং থুইয়ের বিরুদ্ধে।শুধু জমি দখল করেই ক্ষান্ত হননি তিনি। বরং স্থানীয় বাসিন্দাদের নিজের নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবের আওতায় এনে ভুক্তভোগীদের জমিতে চাষাবাদও শুরু করেছেন।
অভিযোগ আছে, হেডম্যানের দায়িত্ব ও ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের জমি নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছেন শৈচিং থুই। শুধু তাই নয়, ভুক্তভোগীদের জমিতে চাষাবাদ শুরু করার অভিযোগও উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। এতে নিজেদের পৈতৃক ও ভোগদখলীয় জমি নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দুটি কাগজের হোল্ডিং নাম্বার যেমন ভিন্নতা রয়েছে তেমনি চৌহদ্দি পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু বৌদ্ধ বিহারে নাম উল্লেখ করা হলেও জায়গাটি ব্যক্তির মালিকানাধীন জায়গা। আর প্রকৃত মালিকের জায়গায়টি কাগজের সাথে ওয়ারিশ নাম প্রমান রয়েছে। তবে অভিযোগ রয়েছে জমি-সংক্রান্ত বিরোধে ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর প্রতিবেদন তৈরির মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে। পাশাপাশি এলাকাবাসীর মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও বিভেদ সৃষ্টি করে বিরোধকে আরও জটিল করে তোলার অভিযোগও রয়েছে। হেডম্যানের পদ-পদবি ও সামাজিক প্রভাবের কারণে অনেকেই প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে সাহস পাচ্ছেন না। ফলে ভুক্তভোগীরা নিজেদের জমির অধিকার নিয়ে এক ধরনের অসহায় পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন।
দুটি কাগজের জবানবন্দি খটিয়ে দেখা গেছে, জবানবন্দিতে ৩৫৩ নং কোলাদি মৌজায় ২৭ নং হোল্ডিয়ে পাঁচ একর ৩য় শ্রেনী পাহাড় দেখানো হয়েছে। যেখানে মালিক হিসেবে নাম রয়েছে মংসিংগ্য মারমা। সেখানে চৌহুদ্দিতে উল্লেখ রয়েছে উত্তরে শীল পাহাড় দক্ষিণে দাব্রো ক্ষ্যং ঝিড়ি ও পূর্বে পাহাড় পশ্চিমে শঙ্খ নদী দেখানো হয়েছে।
অন্যদিকে হেডম্যান দাবি করা জবানবন্দি দেখানো হয়েছে একই মৌজায় ৩য় শ্রেনীর অর্থাৎ পাহাড় জায়গা পরিমান ১ একর। সেখানে মালিক হিসেবে নাম রয়েছে আগাওয়াইং ছা ভিক্ষু নামে। চৌহদ্দি উল্লেখ করা হয়েছে উত্তরে পলিকা ঝিড়ি দক্ষিনে পাহাড় ও পূর্বে প্রুথোয়াই অং পশ্চিমে পাহাড়। কাগজের কলমে বৌদ্ধ বিহারে জায়গা বলে কোন অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
এদিকে দুই জায়গাটিতে পাহাড় আর চৌহুদ্দি ভিন্নভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সাঙ্গু যে চরটি উঠেছে সেখানে প্রকৃত মালিক দাবি করছেন জায়গার মালিকের ওয়ারিশ পিপলু মারমা। কিন্তু সেখানে বাদী সাথে কাগজের আর চৌহদ্দি মিল না থাকলেও জোড়পূর্বকভাবে খাস ও বিহারে নাম ভাঙ্গিয়ে দখলে নেন ওই মৌজার হেডম্যান শৈচিং থুই।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ভুক্তভোগী জায়গাতে সাঙ্গু নদীর চড়কে খাস বলে কয়েকজন নারী বীজ বপন করছেন। সেখানে গ্রামের ১১জন নারী দলবেধে কাজ শুরু করেছেন। তবে কাগজের কলমের জায়গাটি থেকে এক কিলোমিটার দূরে। বিহারে নামে হেডম্যান দাবি করলেও বিহারে নামে কোন অস্তিত্ব জায়গা পাইনি।
দখলকৃত জমিতে কাজ করছেন ১১জন নারী। তাদের মধ্যে কথা হয় সিংনুপ্রু সাথে। তিনি বলেন, জায়গায় কাদের কার আমরা জানি নাহ। রাতে বিহার থেকে মাইকে বলা হয় ভোরে জমিতে বীজ বপন করতে হবে বলে সেজন্য ভিক্ষুর কথায় বীজ বপন এসেছি। মুল ঘটনা কি কোন কিছুই জানি নাহ আমরা।
পলিকা বৌদ্ধ বিহারে অধ্যক্ষ ইন্দ্রিয় ভিক্ষু বলেন, জমিতে চাষ বা বীজ লাগাতে নির্দেশনা আমি দেয়নি। এ ব্যাপারে আমি কিছুই জানি নাহ। তবে দখল না করে পাড়াবাসীরা মালিকের সাথে সমাধান করলে হয়। কিন্ত এত বড় ঘটনা না করলেও হেডম্যান পারত।
অভিযোগ বিষয়ে পলিকা পাড়া বৌদ্ধ বিহারে সভাপতি উবামং মারমা বলেন, আমি আগে বিহারে কমিটিতে ছিলাম নাহ। জায়গায় দখল করতে হেডম্যান আমাকে দুদিনের জন্য সভাপতি বানানো হয়। আর আমাকে বাদি করে হেডম্যান নিজেই অভিযোগ দাখিল করেন। স্বাক্ষর দিতে বলেছে আমি দিয়েছি কেননা আমি অশিক্ষিত কি লেখা আছে আমি পড়তে জানি নাহ।
পলিকা পাড়া গ্রামপ্রধান দুংখি অং মারমা বলেন, হেডম্যান নিজেই লিখে আমাকে একটা কাগজ দিয়েছে। সভাপতি না থাকায় আমি পক্ষে হয়ে স্বাক্ষর করেছি। আর জায়গাটি খাস নাকি মালিকানাধীন সেটা হেডম্যান বলতে পারবে।
ভুক্তভোগী পিপলু মারমা বলেন, আমার বাবা বেঁচে থাকাকালীন অনেক স্থানে জায়গা দান করেছে। কিন্তু এখানে আমার চৌহদ্দি আলাদা আর দখল করতে যে কাগজ দেখানো হয়েছে সেটি চৌহদ্দি আলাদা। বাবা যখন বেঁচে ছিল তখন কেউ দাবি করিনি। বাবার মৃত্যু দুই মাস হেডম্যান নিজেই দখল করতে নেমেছে। আর হাতিয়ার হিসেবে গ্রামবাসীকে ব্যবহার করছে।
তিনি বলেন, হেডম্যান কখনো অন্যের জায়গা,কখনো খাস আবার গ্রামবাসী সবশেষ বিহারে জায়গা বলে দাবি করে আসছে। যার কারণে আমার জায়গায় দখল করেছে আর বর্গা চাষীকেও হেনস্থা করেছে হেডম্যান। আমি এর সুষ্ঠু বিচার দাবি করছি।
এবিষয়ে ৩৫৩ নং কোলাদি মৌজার হেডম্যান শৈচিং থুই মারমা দাবি করে বলেন, তাদের চৌহোদি আলাদা ভিক্ষু চৌহুদি ও আলাদা। কিন্তু যে নদীর চর যেটা আছে সেটা খাস। যার কারণে সেখানে বিহারে নামে দখল করেছি পাড়াবাসী সম্মতিক্রমে। আর এই জায়গায় বিহার কাছে দান করে সেখানে ভাড়া হিসেবে দেয়া হবে।
এবিষয়ে হেডম্যান অস্বীকার করে বলেন, এখানে কারো জায়গা দখল করেনি। যেহেতু তাদের সীমানা নদীর পর্যন্ত সেহেতু নদীর যে চর আছে সেটি খাস বলেছি। যার কারণে পাড়াবাসী কমিটি করে দখল করেছি।
অভিযোগ বিষয়ে রুমা থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আমজাদ হোসেন বলেন, পাঁচ একর দখল নিয়ে এক শিক্ষক কোলাদি হেডম্যান বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। আমরা তদন্ত করে কি ব্যবস্থা নেয়া যায় সেটির দিকে আগাচ্ছি।











