রিমন বড়ুয়ার ঘুষ বাণিজ্যে ‘লাল বাতি’
চট্টগ্রামের দক্ষিণের জনবহুল উপজেলা সাতকানিয়া। দীর্ঘদিন ধরে এখানকার উপজেলা ভূমি অফিস ছিল অনিয়ম, ঘুষ ও দালালচক্রের অভয়ারণ্য। ভূমি অফিসে ফি নয়, আগে দিতে হতো ঘুষের টাকা—এমন অভিজ্ঞতা সাধারণ মানুষের মুখে মুখে। কিন্তু নতুন এসিল্যান্ড সামছুজ্জামান যোগদানের পর যেন সেই অন্ধকার অধ্যায় বদলাতে শুরু করেছে।
ভূমি অফিসের অনিয়মের জাল ছিঁড়ে দেখলে যে নামটি সবচেয়ে বেশি উঠে আসে, সেটি হলো নাজির কাম ক্যাশিয়ার রিমন বড়ুয়া।
ভূমি অফিসে আসা ভুক্তভোগীরা বলছেন—রিমন বড়ুয়ার অনুমতি ছাড়া কোনো ফাইল এগোয় না। শুনানির তারিখ নির্ধারণ থেকে শুরু করে রায়ের কপি পাওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে খোলাখুলি ঘুষের দাবি জানাতেন তিনি।
মো. নোমান নামে সাতকানিয়ার এক সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ভূমি অফিসে গেলে মনে হতো আমরা দেশের নাগরিক না, ভিক্ষুক। শুনানির তারিখ নিতেও ঘুষ, রায়ের কপি নিতেও ঘুষ—এ কেমন রাষ্ট্রব্যবস্থা?
একজন স্থানীয় সাংবাদিক জানান, তার আত্মীয়ের কাছ থেকেও রিমন বড়ুয়া ৭ হাজার টাকা ঘুষ নিয়েছেন।
আরেকজন ভুক্তভোগীর ভাষায়— ফাইল নাড়াতে হলে রিমন বড়ুয়ার হাতে টাকা দিতে হয়, না হলে মাসের পর মাস ফাইল তাকেই তাকিয়ে থাকতে হয়।
নতুন সহকারী কমিশনার (ভূমি) সামছুজ্জামান যোগদানের পরই সাতকানিয়া ভূমি অফিসে নতুন এক বার্তা ছড়িয়ে পড়েছে— এই অফিস হবে হয়রানিমুক্ত ও জনবান্ধব।
সম্প্রতি নিজের দফতরের ফেসবুক আইডি থেকে তিনি লেখেন— উপজেলা ভূমি অফিস ও ইউনিয়ন ভূমি অফিসসমূহে হয়রানিমুক্ত ও জনবান্ধব সেবা প্রদানে আমরা আপনাদের নিকট প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন— নামজারি ফি ও ভূমি উন্নয়ন কর শতভাগ অনলাইনে আদায় করা হয়। কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী যদি অতিরিক্ত অর্থ দাবি করেন, সরাসরি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করুন—০১৭২৩-৫৯৯৫১০।
সামছুজ্জামান সতর্ক করে দেন, ভূমি অফিসে নগদ লেনদেনের কোনো সুযোগ নেই, প্রতিটি টাকা এখন iBASS++ সিস্টেমে সরকারি কোষাগারে জমা হয়।
জনগণকে সচেতন করতে এসিল্যান্ড সামছুজ্জামান নিজেই বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন— একটি নামজারি করতে সরকারি নির্ধারিত মোট খরচ মাত্র ১১৭০ টাকা, এরমধ্যে—কোর্ট ফি: ২০ টাকা, নোটিশ ফি: ৫০ টাকা, রেকর্ড কারেকশন ফি: ১০০০ টাকাও খতিয়ান কপি ফি: ১০০ টাকা।
তিনি লিখেছেন, এই অর্থ অনলাইনে জমা হয়, কোনো নগদ অর্থ প্রদানের প্রয়োজন নেই। ফি ছাড়াও কেউ যদি টাকা দাবি করে, সঙ্গে সঙ্গে অভিযোগ করুন।
এছাড়া তিনি নাগরিকদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন— নিজের জমির কাজ নিজে করুন, দালালদের হাতে অর্থ তুলে দেবেন না। তৃতীয় পক্ষকে অতিরিক্ত টাকা দিলে সেটি সরকারী ফি নয়, ব্যক্তিগত লেনদেন।
এসিল্যান্ড সামছুজ্জামান উল্লেখ করেন, ভূমিসেবা ওয়েবসাইট https://land.gov.bd এখন এত সহজ যে যারা ফেসবুক বা জিমেইল ব্যবহার করতে পারেন, তারাও নিজের ভূমি কাজ অনলাইনে সম্পন্ন করতে পারবেন।
ভূমি অফিসের পুরোনো চিত্রে ছিল দালালদের আনাগোনা, ফাইল হাতে ঘুরে বেড়ানো শত শত ভুক্তভোগী, আর কর্মচারীদের দম্ভভরা আচরণ। এখন সেই পরিবেশে পরিবর্তনের ছোঁয়া। তবে এই পরিবর্তনে খুশি সবাই নয়। অফিসের কিছু পুরোনো কর্মচারী নাকি এখন চুপচাপ। কারণ, এসিল্যান্ড সামছুজ্জামানের চোখ এড়িয়ে এখন কিছুই সম্ভব নয়।
সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, অতীতে রিমন বড়ুয়া শুধু ঘুষই নেননি, বরং দালালদের সঙ্গে মিলে একধরনের “মাফিয়া চক্র” গড়ে তুলেছিলেন, যারা নামজারি ও রেকর্ড সংশোধনের নামে কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য করতেন। নতুন এসিল্যান্ড আসার পর সেই চক্রের একের পর এক ‘বিজনেস’ থমকে গেছে।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে— সামছুজ্জামান সাহেব সততার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এখন তাঁর সাফল্যের সবচেয়ে বড় বাধা হলো রিমন বড়ুয়া ও তার দালালচক্র।
সাতকানিয়ার উদাহরণ ইতিমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে লোহাগাড়া ও বাঁশখালীসহ আশপাশের উপজেলায়। অনেকেই বলছেন, এসিল্যান্ড সামছুজ্জামানের উদ্যোগটি সারা দেশের ভূমি অফিসে অনুসরণযোগ্য মডেল হতে পারে।
একজন স্থানীয় শিক্ষক মন্তব্য করেন— আমরা এত দিন শুনতাম, ভূমি অফিস মানে দুর্নীতির ঘাঁটি। এখন শুনছি, সেখানে দুর্নীতিবিরোধী কর্মকর্তা এসেছেন—এটাই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন।
নতুন এসিল্যান্ড সামছুজ্জামানের হাতে সাতকানিয়া ভূমি অফিসে শুরু হয়েছে এক নৈতিক বিপ্লব। ঘুষের অন্ধকারে জ্বলছে স্বচ্ছতার আলো। দালালচক্রের জায়গায় জায়গা নিচ্ছে ডিজিটাল সেবা।








