সাত দিনে সরাতে হবে অবৈধ স্থাপনা
কেরানীহাটে আবারও উচ্ছেদ আতঙ্ক
দক্ষিণ চট্টগ্রামের একটি প্রাণবন্ত বাণিজ্যকেন্দ্র সাতকানিয়ার কেরানীহাট। প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এখানে চলে মানুষের অবিরাম আনাগোনা, পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, বাস আর ছোট যানবাহনের জটলা। কিন্তু এই কর্মচাঞ্চল্যের মাঝেই লুকিয়ে আছে একটি পুরনো ব্যাধি—অবৈধ দখল আর যানজটের দুর্ভোগ।
গত ১৮ জুনের বড়সড় উচ্ছেদ অভিযানের পর কিছুদিনের জন্য মুক্ত হয়েছিল এই এলাকা। ফুটপাতগুলো আবার পথচারীর জন্য উন্মুক্ত হয়েছিল, সওজের জায়গায় ফিরে এসেছিল খোলা বাতাস। কিন্তু মাত্র তিন মাসের মধ্যেই আবারও সেই জায়গাগুলো দখল হয়ে গেছে। ফের স্থাপিত হয়েছে দোকানপাট, চায়ের স্টল ও ট্রাক পার্কিং। আর তাই উপজেলা প্রশাসন আবারও নামতে যাচ্ছে কঠোর অবস্থানে।
১৮ জুন দুপুর ১টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কেরানীহাট যেন ছিল এক যুদ্ধক্ষেত্র। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সড়ক ও জনপদ (সওজ) বিভাগের কর্মকর্তা, হাইওয়ে পুলিশের একাধিক টিম, সেনাবাহিনীর সদস্য এবং প্রশাসনিক কর্মীরা যৌথভাবে উচ্ছেদ অভিযানে অংশ নেন।
সেই অভিযানে ভেঙে দেওয়া হয় শতাধিক দোকান ও স্থাপনা, যা দীর্ঘদিন ধরে সরকারি জায়গা ও ফুটপাত দখল করে গড়ে তোলা হয়েছিল। সড়ক ও জনপদ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, কেরানীহাট বাজার এলাকায় প্রায় এক কিলোমিটার জায়গা অবৈধভাবে দখল ছিল।
অভিযানের দিন স্থানীয় মানুষজন প্রশাসনের পাশে ছিল। কারণ সবার আশা ছিল, উচ্ছেদের পর অন্তত যানজটমুক্ত হবে কেরানীহাট। কিন্তু আশার দিন স্থায়ী হয়নি। উচ্ছেদের এক সপ্তাহ পরই সন্ধ্যার পর ফুটপাতের পাশে আবার টিন বসানো শুরু হয়। কেউ ছোট দোকান, কেউ বড় টিনের ঘর তৈরি করেন।
একজন দোকান মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা ভাড়া দিয়ে জায়গা নিয়েছিলাম। উচ্ছেদের পর কেউ এসে কিছু বলেনি। এখন আবার বসেছি কারণ এখানে দোকান না দিলে আয় রোজগার বন্ধ হয়ে যাবে।
স্থানীয় এক বাসচালক বলেন, উচ্ছেদের সময় গাড়ি রাখার জায়গা ছিল না। এখন একটু জায়গা মিলেছে, সবাই গাড়ি রাখে। যদি বিকল্প ব্যবস্থা না দেয়, তাহলে এই জায়গা ছেড়ে যাওয়া কঠিন।
শুক্রবার (১০ অক্টোবর) সন্ধ্যায় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কেরানীহাট এলাকায় মাইকিং করে ঘোষণা দেওয়া হয়— উচ্ছেদের পর নতুন করে গড়ে তোলা সব অবৈধ স্থাপনা সাত দিনের মধ্যে নিজ উদ্যোগে সরিয়ে নিতে হবে।
এরপর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উপজেলা প্রশাসন নামক ফেসবুক আইডিতে লিখেছেন— কেরানীহাটের যানজট: একপক্ষের অবৈধভাবে স্থাপিত দোকান/স্থাপনা উচ্ছেদ করার কিছুদিন পর অন্য একপক্ষ নতুন করে অবৈধভাবেই দোকানপাট/স্থাপনা প্রতিষ্ঠা করে। অকেজো, নষ্ট ট্রাক-ডাম্পারের উপর নোটিশ সাঁটানোর পর সেগুলো সরিয়ে নেওয়া হলেও, সেখানে জায়গা দখল করে অন্য মালিকদের বাস-ট্রাক-ডাম্পার।
তিনি আরও লিখেছেন— জনগণের চাওয়া, উপজেলা প্রশাসন প্রতিনিয়ত যানজট নিরসনের কাজ করুক। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সাতকানিয়াবাসী নিজেরা না চাইলে, পরিবহন মালিকদের ভাবোদয় না হলে এই সমস্যার সমাধান করা দুরূহ। যানজট নিরসনে আইনের প্রয়োগের চেয়ে সদিচ্ছা থাকা জরুরি।
কেরানীহাট এলাকা দিয়ে দিনে কয়েক হাজার যানবাহন চলাচল করে। এর মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ও কেরানীহাট-বান্দরবান মহাসড়কের দূরপাল্লার বাস, স্থানীয় সিএনজি, ট্রাক ও মিনি কাভার্ডভ্যান।
সওজের জায়গায় দোকান ও গ্যারেজ থাকায় মূল সড়ক সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় কেরানীহাট বাজার এলাকায় প্রায় দুই কিলোমিটার যানজট লেগেই থাকে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. হোসেন বলেন, আমরা প্রতিদিনই এই যানজটের শিকার হই। বাচ্চাদের স্কুলে পৌঁছাতে ১০ মিনিটের রাস্তা যেতে এক ঘণ্টা লাগে। ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ায় পথচারীরা বাধ্য হয়ে রাস্তায় হাঁটে, এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বাড়ে।
একজন নারী স্কুলশিক্ষক বলেন, উচ্ছেদের পর আশা করেছিলাম একটু স্বস্তি পাবো। কিন্তু এখন আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেছে। মনে হয় কেরানীহাটের দখলবাজদের কোনো ভয় নেই।
কেরানীহাটের দখলবাজির পেছনে রয়েছে জটিল স্থানীয় রাজনীতি ও স্বার্থচক্র। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি সওজের জায়গা “ভাড়া” দিয়ে দেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছে। তারা মাসে ২ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নেন জায়গা ভাড়ার নামে।
একজন ব্যবসায়ী স্বীকার করেন, আমরা কেউ সরাসরি সরকারকে ভাড়া দেই না। কিছু লোক আছে যারা বলে, ‘এই জায়গা আমার নিয়ন্ত্রণে’, তারা টাকা নেয়। উচ্ছেদ হলে ক্ষতি আমাদেরই।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকায় “দখল মানেই প্রভাব”—এমন একটি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। প্রশাসন যতবার উচ্ছেদ করুক, কয়েক সপ্তাহ পরই আবার দখল হয়ে যায়।
কেরানীহাট দক্ষিণ চট্টগ্রামের অন্যতম বাজার। প্রতিদিন কয়েক কোটি টাকার বেচাকেনা হয়। এসব ছোট দোকানদারই এ অর্থনীতির প্রাণশক্তি।
একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বলেন, আমরা সরকারি জায়গায় বসতে চাই না, কিন্তু বিকল্প কোনো জায়গা নেই। যদি অস্থায়ী জায়গা দেয়, তাহলে আমরা সরবো।
অন্যদিকে স্থানীয়রা বলছেন, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের প্রতি সহানুভূতি থাকলেও তারা যেন সড়ক ও ফুটপাত দখল করে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে ব্যাহত না করেন।
গত জুনের উচ্ছেদ অভিযানে সেনাবাহিনী যুক্ত ছিল, যাতে কোনো প্রকার সংঘর্ষ বা বাধা না সৃষ্টি হয়। উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, আগামী উচ্ছেদ অভিযানে আবারও সেনা সহায়তা নেওয়া হবে, যাতে কেউ রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব খাটাতে না পারে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার (ইউএনও) মাহমুদুল হাসান বলেন, আমরা চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছি। ৭ দিনের আল্টিমেটাম শেষ হলে বড় ধরনের উচ্ছেদ অভিযান হবে।
তিনি আরও জানান, উচ্ছেদকৃত জায়গায় নিয়মিত মনিটরিংয়ের পরিকল্পনাও আছে, যাতে পুনর্দখল বন্ধ থাকে।
ইউএনওর ভাষায়, কেরানীহাটের যানজট কেবল প্রশাসনিক নয়, এটি সামাজিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সবাই যদি নিজ নিজ জায়গায় সৎ থাকে, তাহলে প্রশাসনের অভিযান লাগবে না।








