ইয়াবা পাচারের গোপন ট্রানজিট সাতকানিয়া!
চট্টগ্রামের সাতকানিয়া যেন পরিণত হয়েছে ইয়াবার ‘ট্রানজিট হাব’-এ। ব্যস্ত মহাসড়ক আর অন্ধকার গলিই হয়ে উঠেছে মাদক ব্যবসায়ীদের নিরাপদ আশ্রয়। গত এক সপ্তাহে পুলিশের অভিযানে ধরা পড়েছে তিন দফা চালান—উদ্ধার হয়েছে ২,৭৪০ পিস ইয়াবা, বিদেশি রিভলভার ও কার্তুজ। আটক হয়েছেন টেকনাফের কুখ্যাত মাদক কারবারিসহ অন্তত চারজন।
তবে পুলিশি পরিসংখ্যান শুধু বরফখণ্ডের চূড়া—এর নিচে লুকিয়ে আছে ভয়ঙ্কর এক ইয়াবা সাম্রাজ্য, যা নিয়ন্ত্রণ করছে টেকনাফ–সাতকানিয়া করিডরের শক্তিশালী চক্র।
সিন্ডিকেটের গোপন মানচিত্র
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ইয়াবা সিন্ডিকেটের কাঠামোটি পাঁচ স্তরে বিভক্ত—
১. টেকনাফ–মিয়ানমার সংযোগকারী: নাফ নদী পেরিয়ে ইয়াবা আসে নাফের উল্টো পারে থাকা মিয়ানমারের কারখানা থেকে। এই অংশে থাকে সীমান্ত পারাপারের দালাল ও নৌকার মাঝি।
২. রোহিঙ্গা ক্যাম্প নিয়ন্ত্রক: ইয়াবার প্রথম স্টোরেজ হয় টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। এখানেই ‘মাল’ ভাগ হয় এবং কুরিয়ারের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
৩. কুরিয়ার বাহিনী: যেমন ধরা পড়েছে—মো. জোবায়ের, নুর ছৈয়দ, আব্দুর রহমান। এরা সাধারণত মোটরসাইকেল, যাত্রীবাহী বাস কিংবা পণ্যবাহী ট্রাকে মিশিয়ে চালান আনে।
৪. স্থানীয় সহযোগী চক্র: সাতকানিয়ার কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি, পরিবহনকর্মী, এমনকি দোকানদার—যারা আশ্রয়, লজিস্টিক ও নিরাপদ রুট দেয়।
৫. শহরভিত্তিক ডিস্ট্রিবিউটর: মালামাল পৌঁছে যায় চট্টগ্রাম শহর, এমনকি ঢাকায়। এই স্তরে থাকে সবচেয়ে কম ঝুঁকি, কিন্তু সবচেয়ে বেশি লাভ।
সাতকানিয়ার খুনীবটতল — ইয়াবার অন্ধকার গেটওয়ে:
যে জায়গায় দুই দিনে দুইবার ইয়াবা ধরা পড়ল, সেটি কেঁওচিয়ার খুনীবটতল। এখানে চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়কের পাশে রয়েছে বিকল্প রাস্তা, যা অল্প সময়ের মধ্যে অন্য এলাকায় মিলিয়ে যায়।
একজন স্থানীয় দোকানদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রাতের বেলা মোটরসাইকেল, মাইক্রোবাস থামে, দু’মিনিটের মধ্যে মাল বদল হয়ে যায়। কারো পিছু নেওয়ার সুযোগই থাকে না।
সিন্ডিকেটের কৌশল
ভুয়া যাত্রীবাহী পরিচয়: নারী ও শিশুকে সাথে রেখে ইয়াবা বহন, যাতে সন্দেহ কম হয়।
বিভক্ত চালান: এক গাড়িতে পুরো মাল না রেখে একাধিক বাহকে ভাগ করে দেওয়া।
ফ্রন্ট ব্যবসা: ফলের ঝাঁই, মাছের বাক্স, এমনকি মুরগির খাঁচার ভিতর চালান লুকানো।
প্রতিদিন নতুন রুট: কখনো মহাসড়ক, কখনো গ্রামীণ সড়ক—যাতে পুলিশের নজর ফাঁকি দেওয়া যায়।
সাতকানিয়া থানার এক সপ্তাহের ইয়াবা উদ্ধার
প্রথম অভিযান — অস্ত্রসহ ইয়াবা কারবারি ধরা
গত ৫ আগস্ট রাত ১১টা ৩০ মিনিটে সাতকানিয়া সদর ইউনিয়নের করইয়ানগর এলাকায় সেনাবাহিনীর টহলদল ও থানা পুলিশের যৌথ অভিযানে গ্রেফতার হন স্থানীয় বাসিন্দা জানে আলম (৪০)।

তার বাড়ির পশ্চিম পাশের একটি কক্ষ থেকে উদ্ধার হয়— কাঠের বাটযুক্ত একটি পুরনো বিদেশি রিভলভার, একটি পুরনো কার্তুজ ও একটি কার্তুজের খোসা ও ২৩০ পিস ইয়াবা।
দ্বিতীয় অভিযান — মহাসড়কে ২ হাজার ইয়াবার চালান
১১ আগস্ট ভোররাত ৩টা ৫৫ মিনিট। কেঁওচিয়া ইউনিয়নের খুনীবটতল। চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়ক তখন প্রায় ফাঁকা। হঠাৎ পুলিশি ব্যারিকেডে থমকে যায় একটি মোটরসাইকেল। সঙ্গে সঙ্গে ধরা পড়ে দুই তরুণ— মো. জোবায়ের (৩০) ও নুর ছৈয়দ (২০)। তল্লাশিতে জোবায়েরের কাছে এক হাজার পিস ও নুর ছৈয়দের কাছে আরও এক হাজার পিস ইয়াবা পাওয়া যায়। যার আনুমানিক বাজারমূল্য ৬ লাখ টাকা।

পুলিশের ভাষ্যমতে, এরা দুজনেই টেকনাফের লেদা ক্যাম্পের বাসিন্দা এবং একটি বড় সিন্ডিকেটের “কুরিয়ার” হিসেবে কাজ করত। এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, এরা নিজেরা খুচরা ব্যবসায়ী নয়, বরং মাল পরিবহনকারী। এর পেছনে আছে বড় মাথারা।
তৃতীয় অভিযান — একই স্থানে ফের ধরা ৫১০ ইয়াবা
১২ আগস্ট বিকেল ৩টা ৩০ মিনিটে একই স্থানে—কেঁওচিয়া খুনীবটতল এলাকায় অভিযানে ধরা পড়েন আব্দুর রহমান (৪১)।

তিনিও টেকনাফের লেদা ক্যাম্পের বাসিন্দা। তার কাছ থেকে ৫১০ পিস ইয়াবা উদ্ধার হয়।
ইয়াবা রুটের ভয়াবহতা
পুলিশ সূত্র জানায়, টেকনাফ থেকে চট্টগ্রাম হয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ইয়াবা পাচারের প্রধান রুটগুলোর একটি এই কক্সবাজার–চট্টগ্রাম মহাসড়ক। কেঁওচিয়া এলাকার খুনীবটতল ও আশপাশের এলাকা বহুদিন ধরেই নজরদারির তালিকায়।
একজন পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এখানে রাতের অন্ধকার, মহাসড়কের নির্জনতা আর স্থানীয় কিছু সহযোগীর কারণে ইয়াবা সিন্ডিকেটের জন্য নিরাপদ করিডর তৈরি হয়েছে।
পুলিশের কঠোর অবস্থান
সাতকানিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ মো. জাহেদুল ইসলাম বলেন, টানা অভিযান চালাচ্ছি। গত এক সপ্তাহে তিনটি চালান ধরেছি। আমরা জানি, এর পেছনে বড় সিন্ডিকেট আছে—তাদেরও ধরা হবে।








