দিবস ঘিরে ছিল না প্রান্তিক যুবক, নেই স্থানীয় সংগঠন ও সংবাদকর্মীদের সম্পৃক্ততা — কেবল দায়সারা আনুষ্ঠানিকতা
ফটোসেশননির্ভর দায়সারা যুব দিবস পালন সাতকানিয়ায়
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক যুব দিবস-২০২৫ সাতকানিয়ায় উদ্যাপন হলো এমনভাবে, যেন দিনটির তাৎপর্য নয়, বরং সরকারি প্রটোকল পূরণই ছিল একমাত্র লক্ষ্য। দিবসটির প্রকৃত উদ্দেশ্য — তরুণদের অনুপ্রাণিত করা, তাদের মধ্যে সামাজিক দায়বদ্ধতা জাগানো, কর্মসংস্থানে উদ্বুদ্ধ করা — এসবের কোনোটিই কার্যকরভাবে ঘটেনি। বরং আয়োজন সীমাবদ্ধ ছিল কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, হাতে গোনা কয়েকজন শিক্ষার্থী এবং যুবকের উপস্থিতিতে এক ক্ষুদ্র র্যালি ও দ্রুত শেষ হওয়া আলোচনা সভায়।
সবচেয়ে বড় সমালোচনার জায়গা ছিল, স্থানীয় সাংবাদিকদের সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা। অনুষ্ঠানের আগে বা চলাকালীন গণমাধ্যমকে কোনো আমন্ত্রণ জানানো হয়নি, কোনো প্রেস রিলিজ পাঠানো হয়নি, এমনকি ফোনে মৌখিকভাবে জানানোও হয়নি। ফলে সাতকানিয়ার অধিকাংশ সংবাদকর্মী দিবসটি পালনের খবরই জানতে পারেন অনুষ্ঠান শেষে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু ছবি ঘুরে বেড়ানোর পর।
মিনিট কয়েকের র্যালি, নামমাত্র সভা:
মঙ্গলবার (১২ আগস্ট) সকাল ১১টার পর উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণ থেকে একটি ক্ষুদ্র পরিসরের র্যালি বের হয়। এতে অংশ নেয় হাতে গোনা কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা, উপজেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কয়েকজন প্রশিক্ষণার্থী ও কিছু শিক্ষার্থী।
র্যালিটি উপজেলা পরিষদ গেট ঘুরে কয়েক মিনিটের মধ্যেই শেষ হয়। স্থানীয়দের ভাষায়, “এটা যেন হাঁটার চেয়ে বেশি ছিল ছবি তোলার আয়োজন।” এরপর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মোহাং সামছুদ্দীন। প্রধান অতিথি ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান।
সভার প্রতিপাদ্য ছিল — “প্রযুক্তি নির্ভর যুব শক্তি, বহুপাক্ষিক অংশদারিত্বে অগ্রগতি”।
যুব দিবসের প্রকৃত উদ্দেশ্য বনাম সাতকানিয়ার আয়োজন:
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক যুব দিবসের উদ্দেশ্য হলো— তরুণদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরিতে সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে যুব সমাজের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
জাতিসংঘ ঘোষিত এই দিবস বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সেমিনার, কর্মশালা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, প্রদর্শনী এবং দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পালিত হয়। বাংলাদেশের অনেক জেলা-উপজেলায়ও বড় পরিসরে নানা কর্মসূচি হয়। কিন্তু সাতকানিয়ার আয়োজন ছিল এর সম্পূর্ণ বিপরীত — ক্ষুদ্র পরিসরের র্যালি, অল্প সময়ের আলোচনা সভা, আর শেষে কিছু ফটোসেশন। এতে প্রান্তিক এলাকার যুব সমাজ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, খেলাধুলা বা সাংস্কৃতিক সংগঠন, এমনকি যুব সংগঠনগুলোও বাদ পড়ে যায়।
গণমাধ্যম উপেক্ষা: স্বচ্ছতার প্রশ্ন:
স্থানীয় সাংবাদিকদের অভিযোগ, উপজেলা প্রশাসন ও যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর ইচ্ছাকৃতভাবেই গণমাধ্যমকে জানায়নি। এর ফলে অনুষ্ঠানটির স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
এক প্রবীণ সাংবাদিক বলেন, “গণমাধ্যমকে বাদ দিয়ে সরকারি অনুষ্ঠান আয়োজনের মানে হলো আপনি চান না মানুষ জানুক আসলে কী হলো। যদি এটা প্রকৃত অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক আয়োজন হতো, তাহলে সাংবাদিকদের বাদ পড়া সম্ভবই নয়।”
গণমাধ্যমের উপস্থিতি না থাকায় অনুষ্ঠানের খবর তাৎক্ষণিকভাবে প্রচারিত হয়নি। পরে কিছু অংশগ্রহণকারী নিজস্ব মোবাইলে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দিলে বিষয়টি আলোচনায় আসে।
স্থানীয় প্রতিক্রিয়া: ‘ফটোসেশনের জন্য দিবস পালন’:
কয়েকজন স্থানীয় যুব সংগঠক ও সাধারণ নাগরিক এই আয়োজনে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “যুব দিবস পালনের নামে এখানে কিছু লোককে জড়ো করে দায়সারা হাঁটাহাঁটি করা হয়েছে। যুব সংগঠন তো দূরের কথা, সাংবাদিকরাও জানতেন না—এমন আয়োজনে যুব সমাজের কী লাভ?”
এ বিষয়ে উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মোহাং সামছুদ্দীনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সচেতন মহলের মতে, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক যুব দিবসের মতো একটি দিন বছরে একবার আসে — যা তরুণ প্রজন্মকে সম্পৃক্ত, অনুপ্রাণিত ও ক্ষমতায়িত করার বিরল সুযোগ। কিন্তু সাতকানিয়ায় ২০২৫ সালের আয়োজন প্রমাণ করেছে, সঠিক পরিকল্পনা, অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ ও স্বচ্ছতা ছাড়া এই ধরনের দিবস কেবল কাগজে কলমে থেকে যায়।
ফলে প্রশ্ন থেকেই যায় — এমন ফটোসেশননির্ভর দিবস উদ্যাপনে কারো কী প্রকৃত উপকার হলো? যুব সমাজ নাকি শুধু সরকারি রেকর্ড?








