‘মুজিব কোট’ থেকে ‘তারেক ব্যানার’

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। ঢাকার রাজপথে টানা ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ভেঙে পড়ে দীর্ঘমেয়াদি আওয়ামী লীগ সরকার। গুলিস্তান থেকে শাহবাগ—গর্জে ওঠে স্লোগান, পতন ঘটে একদলীয় কর্তৃত্বের। রাজধানীর বাতাস তখন রাজনীতির বিস্ফোরণে ভারী। সেই সময় সাতকানিয়ার ছদাহা ইউনিয়নের এক তরুণ নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের হিসাব কষছিলেন নিরবে—নাম তার মোহাম্মদ বোরহান উদ্দিন।
মাত্র ৯ মাস আগেও যিনি পরিচিত ছিলেন বঙ্গবন্ধু ছাত্র যুব ঐক্য পরিষদের ছদাহা ইউনিয়ন শাখার উপ-অর্থ সম্পাদক হিসেবে, সেই তরুণই আজ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। কারণ, তিনি এখন ছাত্রদলের নেতৃস্থানীয় পদে—সাতকানিয়া সরকারি কলেজ শাখার সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক। বোরহানের এই রূপান্তর অনেকের চোখে ‘বিপরীতমুখী যাত্রা’—যেখানে মুজিব কোট পরা একজন তরুণ এখন তারেক রহমানের ব্যানারে স্লোগান দিচ্ছেন।
স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, বোরহান উদ্দিন ছাত্ররাজনীতির শুরুটা করেন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে। এরপর ‘আওয়ামী-ঘেঁষা’ সংগঠন বঙ্গবন্ধু ছাত্র যুব ঐক্য পরিষদের ছদাহা ইউনিয়ন কমিটিতে উপ-অর্থ সম্পাদকের পদ পান। তার সামাজিক মাধ্যমের পুরনো পোস্টে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি জড়িয়ে বহুবার স্ট্যাটাস দিয়েছেন তিনি। অনেক ছবির ক্যাপশনে লেখা—“বঙ্গবন্ধুর আদর্শই আমার পথচলা”।
তবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরপরই পরিস্থিতি বদলে যেতে থাকে। অনেক স্থানীয় নেতা বিদেশে পাড়ি জমান কিংবা আত্মগোপনে চলে যান। কিন্তু বোরহান থাকেন এলাকায়, যদিও সক্রিয়তা কমিয়ে দেন। তখন থেকেই তার ছাত্রদলের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে দেখা যায়।
সাতকানিয়া সরকারি কলেজ ছাত্রদলের কয়েকজন কর্মী অভিযোগ করেন, বোরহান ২০২৫ সালের শুরুর দিক থেকেই ছাত্রদলের কর্মসূচিতে ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’ সেজে অংশ নিতে থাকেন। ছাত্রদলের এক কর্মী বলেন, আমরা তখনও জানতাম না, এ লোক একসময় ছাত্রলীগের কর্মী ছিল। সে এমনভাবে মিশে গিয়েছিল যেন চিরকাল আমাদের সঙ্গেই ছিল।
এরপর গত ২২ মে সাতকানিয়া সরকারি কলেজ ছাত্রদলের কমিটি প্রকাশের সময় চমকে ওঠেন অনেকে। মোহাম্মদ বোরহান উদ্দিনের নাম সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সেই ঘোষণার দিন থেকেই তার পুরনো ছবিগুলো ঘুরতে থাকে সামাজিক মাধ্যমে।
সাতকানিয়া সরকারি কলেজের এক ছাত্রদলকর্মী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যে লোকটা ৯ মাস আগেও মুজিব কোট পরে মিছিল করতো, সে এখন তারেক রহমানের নাম নিচ্ছে? এটা কীভাবে হয়?” তিনি বলেন, আজকে ছাত্রলীগ, কাল ছাত্রদল—এটা চলতে থাকলে সংগঠনের আদর্শ বলে কিছু থাকবে না।
বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ করা হয় চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রদলের সভাপতি রবিউল হোসেন রবি’র সঙ্গে। ছাত্রলীগ ঘরানার কাউকে কেন গুরুত্বপূর্ণ পদে নেওয়া হলো- জানতে চাওয়া তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে রাজনৈতিক সচেতন মহল মনে করেন, ছাত্ররাজনীতিতে আদর্শের জায়গাটা এখন অনেকটাই ফিকে। এখন যেটা দেখা হয়—কে কোন সময় কতটা কাজে আসবে। বোরহান যদি শক্তিশালী, প্রভাবশালী হয়, তাহলে আদর্শের প্রশ্নকে অনেকেই পাশ কাটিয়ে যায়। তাদের মতে, এই ‘রং বদল’ প্রবণতা আমাদের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়েই প্রশ্ন তোলে। নতুন রাজনীতির নামে যদি পুরনো কৌশলই চলে, তাহলে বদল কিসের?
সাতকানিয়ার ছাত্ররাজনীতি এখন মুখরিত। কেউ বলছেন, বোরহান একজন ‘রাজনৈতিক ক্যামেলিয়ন’—যিনি পরিস্থিতি বুঝে রং বদলান। আবার কেউ বলছেন, এটি সময়ের দাবি—রাজনীতি এখন আর স্থির নয়। তবে প্রশ্নটা থেকেই যাচ্ছে—ছাত্ররাজনীতি কি আদর্শের লড়াই, না পদ-পাওয়ার খেলা? বোরহান উদ্দিনের যাত্রা যদি ‘নতুন বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি’ হয়, তাহলে সেই বাংলাদেশের চরিত্র কেমন হবে?











