কক্সবাজারের পাটুয়ারটেকে কাছে সৈকতে মৃত অলিভ রিডলি কচ্ছপ
কক্সবাজার থেকে: বিকেলের নরম আলো তখনো পাটুয়ারটেক সৈকতের ভেজা বালু ছুঁয়ে ঝিলমিল করছিল। দূরে পর্যটকদের হাসি–কোলাহল, কাছেই সাগরের অবিরাম গর্জন—সব মিলিয়ে যেন শীতের আবহ। কিন্তু সেই চিত্রের মাঝেই হঠাৎ চোখে পড়ে হৃদয়বিদারক এক দৃশ্য। সৈকতের এক নিরিবিলি অংশে বালুর ওপর নিথর হয়ে পড়ে আছে একটি বড় আকারের সামুদ্রিক কচ্ছপ। মুখ ও শরীরজুড়ে রক্তাক্ত ক্ষতচিহ্ন, প্রাণহীন দেহটি যেন নীরবে কোনো নিষ্ঠুরতার গল্প বলছে।
বুধবার (৭ জানুয়ারি) বিকেলে কক্সবাজারের ইনানীর কাছাকাছি পাটুয়ারটেক এলাকায় বেড়াতে গিয়ে একুশে পত্রিকার সাংবাদিকরা এই দৃশ্যের সাক্ষী হন। ভাটার সময় সাগরের পানি নেমে গেলে ভেজা বালুর ওপর কচ্ছপটি আটকে পড়ে। কাছে গিয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়, এটি বিপন্ন প্রজাতির অলিভ রিডলি সামুদ্রিক কচ্ছপ।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, জোয়ারের সময় মৃত কচ্ছপটি ভেসে তীরে আসে। ভাটা শুরু হলে সেটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কচ্ছপটির মুখের ভেতর ও বাইরে গভীর জখম থাকায় ধারণা করা হচ্ছে, এটি হয়তো জেলেদের জালে আটকা পড়ে শ্বাসরোধে মারা গেছে, কিংবা কোনো ট্রলারের পাখার আঘাতে প্রাণ হারিয়েছে। সৈকতে ঘুরতে আসা পর্যটকেরাও কচ্ছপটিকে ঘিরে ভিড় করেন। অনেকের চোখেমুখেই ফুটে ওঠে বিষণ্নতা ও বিস্ময়।
বিশেষজ্ঞরা জানান, নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত অলিভ রিডলি কচ্ছপের প্রজনন মৌসুম। এ সময় তারা গভীর সমুদ্র ছেড়ে উপকূলের দিকে আসে ডিম পাড়ার জন্য। কিন্তু কক্সবাজার উপকূলে অবৈধ কারেন্ট জাল, পরিত্যক্ত ‘ঘোস্ট নেট’ এবং নিয়ন্ত্রণহীন ট্রলার চলাচল এই নিরীহ প্রাণীগুলোর জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। মুখের ক্ষতচিহ্ন দেখে অনুমান করা হচ্ছে, বড়শি বা জালে আটকে এটির মৃত্যু হয়েছে।
এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট (বিওআরআই) এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে মাত্র ২৭ দিনের ব্যবধানে কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকা থেকে ৯৮টি মৃত সামুদ্রিক কচ্ছপ উদ্ধার করা হয়। এর আগের বছর, ২০২৪ সালের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৩০। অর্থাৎ প্রতি শীত মৌসুমেই উপকূলে বাড়ছে কচ্ছপ মৃত্যুর করুণ পরিসংখ্যান।
পরিবেশবিদরা সতর্ক করে বলছেন, সামুদ্রিক কচ্ছপ শুধু একটি প্রাণী নয়—এরা সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ রক্ষক। জেলিফিশসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণী নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তারা সাগরের ভারসাম্য বজায় রাখে। এভাবে প্রজননক্ষম মা কচ্ছপগুলো যদি একের পর এক মারা যেতে থাকে, তবে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ উপকূল থেকে এই প্রজাতি হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।
পাটুয়ারটেক সৈকতে পড়ে থাকা নিথর কচ্ছপটি যেন নিঃশব্দে মানুষের বিবেককে প্রশ্ন করে—নতুন প্রাণ সৃষ্টির আশায় তীরে আসা এই অতিথিদের আমরা কেন ফিরিয়ে দিচ্ছি মৃত্যুর বিনিময়ে? সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে সৈকতের আলো নিভে আসে, অন্ধকারের সঙ্গে মিলিয়ে যায় কচ্ছপটির দেহও। কিন্তু থেকে যায় এক গভীর বেদনা আর প্রকৃতির প্রতি মানুষের দায়িত্ববোধের কঠিন প্রশ্ন।








