জনসমুদ্রে রূপ নিল হাদির জানাজা, রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন
লাখো মানুষের অশ্রুসিক্ত উপস্থিতিতে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ও জুলাইযোদ্ধা শরীফ ওসমান হাদির জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার রাজধানীর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজা ও মানিক মিয়া এভিনিউ সংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকায় এ জানাজা অনুষ্ঠিত হয়, যা স্মরণকালের বৃহত্তম জানাজাগুলোর একটি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সকাল থেকেই হাদির জানাজায় অংশ নিতে রাজধানীর সংসদ ভবন এলাকায় ঢল নামে মানুষের। ঢাকা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা নানা শ্রেণি-পেশা ও দল-মতের মানুষ সকাল থেকেই মানিক মিয়া এভিনিউ ও সংসদ চত্বরে জড়ো হতে থাকেন। দুপুরের আগেই পুরো এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়।
নিরাপত্তা ভেঙে জনতার স্রোত
সাড়ে ১১টার দিকে সংসদ ভবনের প্রধান ফটক খুলে দেওয়া হলে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে জানাজায় অংশগ্রহণকারীদের ভেতরে প্রবেশ করানো হয়। তবে লোকসমাগম বেড়ে যাওয়ায় একপর্যায়ে তল্লাশি কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। জনতার চাপে নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙে অনেকেই সংসদ ভবন এলাকায় প্রবেশ করেন। মানিক মিয়া এভিনিউ, ধানমণ্ডি, ফার্মগেট, খামারবাড়ি ও বিজয় সরণি এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে মানুষের স্রোত।
রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের উপস্থিতি
দুপুর ২টার দিকে জানাজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। জানাজার আগে ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন শহীদ হাদির সংক্ষিপ্ত জীবনী পাঠ করেন। এরপর বক্তব্য দেন ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের ও প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সবশেষ আবেগঘন বক্তব্য রাখেন শহীদ হাদির বড় ভাই অধ্যক্ষ আবু বকর সিদ্দিক। তার বক্তব্যের সময় জানাজায় উপস্থিত অসংখ্য মানুষ কান্নায় ভেঙে পড়েন।
অধ্যক্ষ আবু বকর সিদ্দিকের ইমামতিতে জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় প্রধান উপদেষ্টা ছাড়াও উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা, বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা অংশ নেন। এছাড়া সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানসহ তিন বাহিনীর প্রধানরাও জানাজায় উপস্থিত ছিলেন।
দাফন ঢাবিতে, শেষ বিদায় সহযোদ্ধাদের
জানাজা শেষে শরীফ ওসমান হাদির মরদেহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অভিমুখে নেওয়া হয়। পথে সংসদ ভবন ও আশপাশের এলাকায় সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে মরদেহ পৌঁছালে সেখানে উপস্থিত সহযোদ্ধা, শিক্ষার্থী ও শুভানুধ্যায়ীরা আবেগে ভেঙে পড়েন।
পরে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধি কমপ্লেক্সে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে দাফন করা হয়। দাফনে অংশ নেন আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমদ খান, ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম, এনসিপি নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহসহ হাদির ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধারা। বিকাল ৪টার দিকে দাফন শেষে মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। মোনাজাতে কান্নাজড়িত কণ্ঠে হাদির বড় ভাই আল্লাহর কাছে তার শাহাদত কবুলের দোয়া করেন।
হত্যাকাণ্ডের পটভূমি
উল্লেখ্য, ঢাকা-৮ আসন থেকে সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতিতে থাকা শরীফ ওসমান হাদি গত ১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজের পর পল্টন এলাকায় রিকশায় থাকা অবস্থায় আততায়ীর গুলিতে গুরুতর আহত হন। প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে ১৫ ডিসেম্বর এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে তাকে সিঙ্গাপুর নেওয়া হয়। সেখানেই ১৮ ডিসেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
তার মৃত্যুর খবরে সারাদেশে শোকের ছায়া নেমে আসে। হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ ও বিচার দাবিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ ও অবরোধ কর্মসূচি পালিত হয়। শুক্রবার সন্ধ্যায় তার মরদেহ দেশে আনা হলে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের হিমঘরে রাখা হয়।











