শরিফ ওসমান হাদি আর নেই
জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করেছিলেন। হয়তো স্বপ্ন দেখেছিলেন—একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজের, একটি স্বাধীন সিদ্ধান্তের বাংলাদেশের। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই থেমে গেল তার হৃদস্পন্দন।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি আর নেই।
(ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)
আজ বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) রাত পৌনে ১০টার দিকে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছয় দিন পর মৃত্যু বরণ করেন তিনি।
হাদির মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করা হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তার ভেরিফায়েড পেজ থেকে। সেখানে দেওয়া এক আবেগঘন পোস্টে বলা হয়—
“ভারতীয় আধিপত্যবাদের মোকাবিলায় মহান বিপ্লবী ওসমান হাদীকে আল্লাহ শহীদ হিসেবে কবুল করেছেন।”
রক্তাক্ত সেই দিন
গত শুক্রবার (১২ ডিসেম্বর) দিন। রাজধানীর পুরানা পল্টন এলাকা। রিকশায় বসে ছিলেন শরিফ ওসমান হাদি। হঠাৎ চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে দুর্বৃত্তদের ছোড়া গুলিতে রক্তাক্ত হয়ে পড়েন তিনি। মুহূর্তেই থমকে যায় চারপাশ।
আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে দ্রুত এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য গত সোমবার তাকে নেওয়া হয় সিঙ্গাপুরে। কিন্তু সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে অবশেষে থেমে যায় তার জীবনসংগ্রাম।
গ্রামের মাটি থেকে রাজনীতির স্বপ্ন
১৯৯৩ সালে ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম শরিফ ওসমান হাদির। পিতা ছিলেন একজন মাদ্রাসা শিক্ষক—নৈতিকতা, আদর্শ ও ধর্মীয় মূল্যবোধ যার কাছ থেকেই হাদির জীবনের ভিত্তি গড়ে ওঠে। তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট।
ঝালকাঠির ঐতিহ্যবাহী এন এস কামিল মাদ্রাসায় তার শিক্ষাজীবনের শুরু। মেধা ও অধ্যবসায়ের পরিচয় দিয়ে সেখান থেকেই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করেন তিনি। উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে পরে ঢাকায় পাড়ি জমান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হন হাদি। ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ খ্যাত এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই তিনি অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও মানুষের অধিকার—এই বিষয়গুলোই ছিল তার ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু।
শিক্ষকতা থেকে আন্দোলনের ময়দান
ছাত্রজীবন শেষে তিনি বেছে নেন শিক্ষকতার মহান পেশা। প্রথমে একটি স্বনামধন্য কোচিং সেন্টারে, পরে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি ছিলেন প্রিয়, সহজবোধ্য ও অনুপ্রেরণাদায়ী এক শিক্ষক।
পরিবার, শিক্ষকতা আর চিন্তাশীল রাজনীতি—এই তিনটি নিয়েই আবর্তিত হতো তার জীবন। তিনি ছিলেন এক সন্তানের জনক। সংসারের ব্যস্ততার মাঝেও দেশের জন্য কিছু করার তাগিদ তাকে বারবার টেনে নিয়েছে রাজনীতির কঠিন পথে।
অপূর্ণ স্বপ্ন, অপূরণীয় শূন্যতা
শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুতে পরিবার হারাল এক আদর্শবান সন্তান, সন্তান হারাল একজন স্নেহময় পিতা, আর দেশ হারাল এক সম্ভাবনাময় কণ্ঠস্বর।
একটি জীবন থেমে গেল, কিন্তু প্রশ্নগুলো রয়ে গেল—
কারা থামিয়ে দিল এই কণ্ঠ?
কবে নিরাপদ হবে ভিন্নমত?
আজ শুধু একটি মৃত্যু নয়, নিভে গেল অনেক স্বপ্ন, অনেক আশা।











