ঠিক সন্ধ্যো নামার পর থেকেই দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র খ্যাত সাতকানিয়ার কেরানীহাট মোড়ে সবুজ রঙয়ের লেজার লাইটের রশ্মি দেখা যায়। কোত্থেকে সেই রশ্মি আসছে, কৌতূহল নিয়ে তাকালেই দেখা যাবে, যান নিয়ন্ত্রণে ‘ক্ষতিকর’ এই লাইট ব্যবহার করছে ট্রাফিক পুলিশ।
এ মোড় ব্যবহার করে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও বান্দরবানে চলাচলকারী বাস, ট্রাক, মোটরসাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও রিকশার চালক এবং পথচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কয়েক বছর ধরে ট্রাফিক পুলিশ ক্ষতিকর এই লেজার লাইট ব্যবহার করছে। এই লাইট চোখে এসে পড়লে তৎক্ষণাৎ চোখ ঝাপসা হয়ে যায়, যা স্বাভাবিক হতে কয়েক মিনিট সময় লাগে। অনেক সময় চোখ জ্বালাপোড়াও করে। এ ছাড়া, চোখের ক্ষতির পাশাপাশি এই লাইটের ব্যবহারে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।
লাইট অ্যামপ্লিফিকেশন বাই স্টিমুলেটেড এমিশন অব রেডিয়েশন, যার সংক্ষিপ্ত রূপ লেজার। এটি এক ধরনের আলোক রশ্মি। বিশেষ উদ্দীপনায় বিকিরণ ঘটিয়ে সাধারণ আলোর ক্ষমতা ও শক্তি বহুগুণ বাড়িয়ে তৈরি করা হয় লেজার। চিকিৎসাক্ষেত্রে কসমেটিক সার্জারি, ত্বকের চিকিৎসা, ক্ষতস্থান নিরাময়, দাঁত কিংবা চোখের চিকিৎসায় লেজার রশ্মির ব্যবহার হয়। কিন্তুরাতে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের হাতে হাতে দেখা যায় লেজার লাইট। এই লাইট ছুড়ে তারা যানবাহনকে সংকেত দেন।
চক্ষু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই লেজার লাইটের রশ্মি চোখে এসে পড়লে রেটিনার ক্ষতিসহ তা অন্ধত্বের ঝুঁকি তৈরি করে। আর পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের লাইটের ব্যবহার দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ায়।
নিয়মিত কেরানীহাট মোড় হয়ে বাসায় যাতায়াত করেন মোটরসাইকেলচালক তারেকুলি ইসলাম (২৭)। তিনি বলেন, ‘এই লেজার লাইট চোখে পড়লে সামনে আর তাকাতে পারি না। একদিন মোটরসাইকেল চালিয়ে যাচ্ছি, হঠাৎই লাইটটা আমার চোখে এসে পড়ল, আর আমার সামনে ছিল একটা সাইকেল। দুর্ঘটনা এড়াতে আমি তৎক্ষণাৎ মোটরসাইকেল থামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ি।’
‘কী ধরনের লাইট ব্যবহার করা যাবে না, ট্রাফিক পুলিশ তো আমাদেরকে সেই বিষয়ে সচেতন করবে। অথচ উল্টো তারাই এ ধরনের লাইট ব্যবহার করছে। এটা তো আমাদের জন্য বিপজ্জনক। এই ক্ষতিকর লাইট যারা ব্যবহার করছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত’, বলেন তিনি।
নুরুল ইসলাম (৫৬) নামের একজন বলেন, ‘পথে চলাচলের সময় প্রায়ই এই লাইট চোখে এসে পড়ে, যা ক্ষতিকর তো বটেই, অত্যন্ত বিরক্তিকরও। কেরানীহাটে নিয়মিতই ট্রাফিক পুলিশ এই লাইট ব্যবহার করে। এই লাইটের আলো চোখে এসে পড়লে চোখ জ্বলে এবং ঝাপসা দেখি।’
একই অভিজ্ঞতা বাসচালক আব্দুস সবুরেরও (৪৫)। ‘প্রায়ই এই লাইট চোখে এসে পড়ে। তখন তো ঘোলা দেখি’, বলেন তিনি।
গাড়িচালক মো. ইলিয়াস (৪৮) জানান, এই লাইট চোখে এসে পড়লে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যায়, যা ঠিক হতে কয়েক মিনিট সময় লেগে যায়। ‘আবার অনেক সময় এই লাইটের আলো লুকিং গ্লাসেও পড়ে। সেখান থেকেও চোখে আসে। আবার লুকিং গ্লাসে লাইট পড়লে তখন আশপাশের গাড়ি দেখা যায় না’, বলেন ইলিয়াস।
ট্রাফিক পুলিশ ক্ষতিকর এই লাইট কেন ব্যবহার করছে প্রশ্ন তুলে গাড়ি চালক নেজাম উদ্দিন (৪০) বলেন, ‘প্রায়ই হঠাৎ করে এই লাইট চোখে এসে পড়ে। তখন চোখে অন্ধকার দেখি। চোখের ক্ষতি করে কেন লেজার লাইট ব্যবহার করতে হবে?’
চক্ষু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লেজার লাইটের রশ্মি যদি চোখের রেটিনায় পৌঁছায়, তাহলে আমরা যে অংশ দিয়ে দেখি ম্যাকুলা, সেটা বার্ন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সেটা হলে তো সে আর চোখে দেখবে না। আর লেন্সে এই রশ্মি পড়লে ছানি হতে পারে। আবার চোখে পড়লে প্রদাহও হতে পারে। সবচেয়ে বেশি সমস্যা হলো ছানি পড়া, আর রেটিনাতে লেজার পড়ার কারণে ম্যাকুলা বার্ন হয়ে গেলে দৃষ্টিশক্তি কমে যাবে। এতে অন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়। আবার এই লেজার লাইট চোখে পড়ার পর তৎক্ষণাৎ চোখ ঝাপসা হয়ে যায়। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ে।
লেজার লাইট ব্যবহার করা কোনোভাবেই উচিত না উল্লেখ করে এই চক্ষু বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, চিকিৎসকরা অপারেশনে জন্য লেজার লাইট ব্যবহার করে। যেমন: ডায়াবেটিসের জন্য চোখে রক্তক্ষরণ হয়, তখন লেজার লাইট দিয়ে রেটিনা বার্ন করে দেওয়া হয়, যাতে আর রক্তক্ষরণ না হয় বা নতুন রক্তনালী তৈরি না হয়। আবার ছানির অপারেশনসহ বিভিন্ন রকমের সার্জারির জন্য লেজার লাইট ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু বাইরে এটা ব্যবহার করা তো নিষিদ্ধ। এটা ঠিক না। বিভিন্ন চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন ধরনের লেজার আছে। কিন্তু ট্রাফিক পুলিশ তো না জেনেই এটা ব্যবহার করছে। সেটা চোখের রেটিনা পর্যন্ত পৌঁছালে তো বেশ ক্ষতিকর হবে।
মানবাধিকারকর্মী শহীদুল ইসলাম বাবর বলেন, ‘এই ধরনের লাইট চোখের ক্ষতি করে এবং সড়ক নিরাপত্তা জন্য ভয়ঙ্কর ঝুঁকি তৈরি করে। আমি মনে করি, এই লাইট ব্যবহারের মধ্য দিয়ে কোনো ধরনের উপকার হয় না। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জরুরি ভিত্তিকে বিষয়টি বিবেচনা করে এই লাইট ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেবে বলে আমি প্রত্যাশা করি।’
কেরানীহাট পুলিশ বক্সের ট্রাফিক ইনচার্জ (টিআই) মো. মাহবুবের কাছে এই লাইট ব্যবহারের বিষয়ে জানতে চাইলে ‘এটা ব্যবহার করা ক্ষতিকর’ স্বীকার করে তিনি বলেন, অনেক সময় দূরে থেকে তাদেরকে যান নিয়ন্ত্রণ করতে হয় এবং জোরে কথা বললেও শোনা যায় না যানবাহনের শব্দের কারণে। সেই কারণেই তারা এই লাইট ব্যবহার করছেন।
ট্রাফিক বিভাগ থেকে এই লাইট দেওয়া হয়েছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ট্রাফিক বিভাগ থেকে দেওয়া হয়নি, আমরা নিজেরা কিনে তা ব্যবহার করছি।’
এদিকে, অনিয়ন্ত্রিত লেজার লাইট ব্যবহার কেন অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়ে ২০২৫ সালের ৪ মার্চ রুল জারি করেন হাইকোর্ট। রুলে এই অনিয়ন্ত্রিত লেজার লাইট ব্যবহার তাৎক্ষণিকভাবে কেন নিষিদ্ধ করা হবে না তাও জানতে চাওয়া হয়। এক রিট আবেদনের শুনানি নিয়ে বিচারপতি ফাতেমা নজীব ও বিচারপতি শিকদার মাহমুদুর রাজির হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।