আইআইইউসি টাওয়ারের ১২ কোটি টাকা আত্মসাৎ:
সাবেক এমপি নদভী দম্পতিসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা আন্তর্জাতিক
আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম (আইআইইউসি) ট্রাস্ট পরিচালিত ‘আইআইইউসি টাওয়ার’ থেকে প্রায় ১২ কোটি ৮০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সাবেক সংসদ সদস্য প্রফেসর ড. আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামুদ্দিন নদভী দম্পতিসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
বৃহস্পতিবার (৩১ অক্টোবর) দুদকের উপসহকারী পরিচালক কমল চক্রবর্তী বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দুদক চট্টগ্রামের উপপরিচালক সুবেল আহমেদ।
তিনি জানান, “মামলায় ১৬ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্তে নতুন কেউ জড়িত পাওয়া গেলে তাকেও আসামি করা হবে।”
প্রধান আসামি সাবেক এমপি নদভী
দুদকের মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে আওয়ামী লীগের সাবেক সাংসদ ও আইআইইউসি বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামুদ্দিন নদভীকে।
এছাড়া তার স্ত্রী রিজিয়া রেজা সুলতানাসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য, ট্রাস্টের সদস্য ও বেশ কয়েকজন শিক্ষক–কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়েছে।
আসামিদের মধ্যে রয়েছেন—
প্রফেসর আনোয়ারুল আজিম আরিফ, প্রফেসর ড. কাজী দ্বীন মোহাম্মদ, প্রফেসর ড. মোহাম্মদ সালেহ জহুর, ড. ইঞ্জিনিয়ার রশিদ আহমেদ চৌধুরী, প্রফেসর ড. ফসিউল আলম, প্রফেসর মো. আবদুর রহিম, ড. মো. শামসুজ্জামান, প্রফেসর ড. হুমায়ুন কবির, অধ্যাপক মাহি উদ্দিন, অধ্যাপক আফজল আহমদ, ড. মোজাফফর হোছাইন নদভী, মোহাম্মদ খালেদ মাহমুদ, মোহাম্মদ বদিউল আলম ও মুহাম্মদ শফিউর রহমান।
অভিযোগ: ট্রাস্টের ১২ কোটি টাকার বেশি আত্মসাৎ
দুদকের অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের মার্চ থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত সময়ের মধ্যে আসামিরা ট্রাস্টের ১২ কোটি ৭৯ লাখ ৪১ হাজার ৫৫৬ টাকা আত্মসাৎ করেন।
আইআইইউসি ট্রাস্ট একটি অলাভজনক ও দাতব্য প্রতিষ্ঠান, যার আয় ব্যয় হওয়ার কথা শিক্ষাবৃত্তি, গবেষণা ও সমাজকল্যাণমূলক কাজে। কিন্তু আসামিরা নিজেদের স্বার্থে এ অর্থ ব্যবহার করেন, যা ট্রাস্ট আইন ও বিধির পরিপন্থী।
আইআইইউসি টাওয়ারের পেছনের গল্প
২০০৫ সালে ট্রাস্টটি চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে একটি প্লট কিনে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সহায়তায় ১৫ তলা বাণিজ্যিক ভবন ‘আইআইইউসি টাওয়ার’ নির্মাণ করে। ২০১১ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হয় এর বাণিজ্যিক কার্যক্রম।
তদন্তে জানা যায়, ট্রাস্টের সদস্যরা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করার কথা থাকলেও বছরের পর বছর ধরে নিয়মবহির্ভূতভাবে সম্মানী, বোনাস, টিএ/ডিএ ও অন্যান্য ভাতা নিয়েছেন।
নদভী ও পরিবারের আর্থিক সুবিধা
বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তাদের বরাতে দুদক জানায়, টাওয়ার থেকে নদভী মাসে সম্মানী নিতেন ১০ লাখ ৯ হাজার ৩৩৩ টাকা, জ্বালানি বাবদ ৫০ হাজার টাকা, মোবাইল বিল ৭ হাজার টাকা এবং দুই ঈদে প্রতিবার উৎসব ভাতা হিসেবে পেতেন ৬ লাখ ২২ হাজার ২২৩ টাকা।
তার স্ত্রী রিজিয়া রেজা সুলতানা পেতেন মাসে ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা সম্মানী, মোবাইল বিল ৩ হাজার টাকা এবং প্রতি ঈদে ২ লাখ ২২ হাজার টাকার উৎসব ভাতা।
ভাইস চেয়ারম্যান কাজী দ্বীন মোহাম্মদ পেতেন ৬ লাখ ৩০ হাজার টাকা মাসিক সম্মানী এবং উৎসব ভাতা হিসেবে ৪ লাখ ১৭ হাজার টাকা।
দুবাইয়ে চিকিৎসা বাবদ ৩০ লাখ টাকা পাঠানো
দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, নদভীর স্ত্রী রিজিয়া রেজা দুবাইয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে টাওয়ার থেকে ৩০ লাখ টাকা পাঠানো হয় মেডিকেল খরচ হিসেবে, যদিও ট্রাস্টের কোনো সদস্যের এমন ভাতা পাওয়ার নিয়ম নেই।
এই টাকা পরবর্তীতে জাল রেজুলেশনের মাধ্যমে ‘সমন্বয়’ দেখানো হয়, যেখানে নদভী ও তৎকালীন রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষর পাওয়া গেছে।
টাওয়ারের আয়-ব্যয় লুকিয়ে রাখা হতো
২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক বিবরণীতে টাওয়ার থেকে কোনো আয় দেখানো হয়নি।
দুদক বলছে, চ্যান্সেলরের অনুমতি ছাড়াই দুই দফায় প্রায় চার লাখ ডলারের সমপরিমাণ অর্থ সৌদি আরবে পাঠানো হয়েছে, যা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০-এর ধারা ৪৪(৬)-এর সরাসরি লঙ্ঘন।
টাওয়ারের আয় মূল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টে জমা না দিয়ে আলাদা অ্যাকাউন্টে রেখে অর্থ আত্মসাৎ করা হতো, যার পরিমাণ তিন বছরে অন্তত ৩২ কোটি টাকা।
দুদকের অবস্থান
দুদক জানায়, “পর্যাপ্ত প্রমাণের ভিত্তিতেই মামলা করা হয়েছে। এখন আইন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
প্রেক্ষাপট
আইআইইউসি টাওয়ার থেকে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৯০ লাখ টাকা আয় হতো। নিয়ম অনুযায়ী এই অর্থ ব্যয় হওয়ার কথা বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীদের কল্যাণে।
কিন্তু তদন্তে দেখা গেছে, এই আয় ব্যক্তিগত খাতে সরিয়ে নিয়ে ভাগাভাগি করে নিয়েছেন ট্রাস্টি সদস্যরা।











