১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর। রাত তখনো ফুরোয়নি। ঢাকার আকাশে গুলির শব্দ। ঘুমহীন নগরবাসী রেডিওর দিকে কান পেতে আছে।
হঠাৎ রেডিও বাংলাদেশের ঢাকা কেন্দ্র থেকে ঘোষকের কণ্ঠে স্লোগান ভেসে এল: “সিপাহি বিপ্লব জিন্দাবাদ।” পরদিন দৈনিক ইত্তেফাক সেই সকালের ঢাকাকে বর্ণনা করেছিল “প্রাণবন্যার উচ্ছল নগরী” হিসেবে।
৫১ বছর পর আজ সেই দিন। তবে এবারের ৭ নভেম্বর আগের অনেক বছরের মতো নয়। দিনটি আবার সরকারি ক্যালেন্ডারে ছুটির দিন হিসেবে ফিরেছে।
চলতি বছরের ১৬ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে ৭ নভেম্বরকে আবার ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে পালন এবং দিনটিকে ‘ক-শ্রেণি’ভুক্ত দিবস ঘোষণা করে সরকারি ছুটি পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত হয়। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি তখন জানান, গত ১৬ বছর দিবসটি রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হয়নি; এখন থেকে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনের পাশাপাশি এদিন ছুটি থাকবে।
অর্থাৎ দেড় যুগ পর এটাই প্রথম ৭ নভেম্বর, যেদিন অফিস-আদালত বন্ধ রেখে রাষ্ট্র নিজেই দিনটি পালন করছে। আর ১৯৭৫ সালের সেই ভোরে যাঁর মুক্তির খবর বেতারে এসেছিল, সেই জিয়াউর রহমানের ছেলে এবার দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দিনটির মুখোমুখি।
চট্টগ্রামের কানে চেনা কণ্ঠ
চট্টগ্রামের মানুষের কাছে এই দিনের একটা আলাদা প্রতিধ্বনি আছে। একাত্তরের মার্চে কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান। সেই কণ্ঠ প্রথম ছড়িয়েছিল এই শহর থেকেই।
সাড়ে চার বছরেরও বেশি সময় পর, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর, দেশ আবার বেতারে শোনে সেই কণ্ঠ: “আমি জিয়া বলছি।” এবার ঢাকা থেকে। ভাষণে তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থেকে কঠোর পরিশ্রমের আহ্বান জানান।
আবার এই চট্টগ্রামেই, সার্কিট হাউসে, ১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় নিহত হন জিয়াউর রহমান। এক শহরে শুরু, আরেক শহরে মোড় বদল, আবার এই শহরেই শেষ। চট্টগ্রামের ইতিহাসে তাই দিনটির ভার একটু বেশি।
পত্রিকার পাতায় সেদিনের সকাল
৮ নভেম্বরের পত্রিকাগুলো পড়লে বোঝা যায়, ঢাকার রাস্তায় সেদিন কী ঘটেছিল। দৈনিক সংবাদ লিখেছিল, রাত প্রায় দুটোয় বেতারে ঘোষণা আসার পরপরই রাজপথে নেমেছিল মানুষ। ট্যাংকের কামানের নলে মালা পরানো হয়েছিল, সৈনিকদের মুখে মিষ্টি তুলে দিয়েছিল পাড়ার মানুষ।
দৈনিক বাংলা জানিয়েছিল, রায়েরবাজার, জিগাতলা, ধানমন্ডি থেকে শাহবাগ পর্যন্ত ভোর থেকেই লোকে লোকারণ্য। বেলা দুটোর দিকে জিয়ার আহ্বানে সৈনিকেরা ছাউনিতে ফিরে যান, কিন্তু রাস্তায় মিছিল থামেনি।
ছোট একটা তথ্য অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। সেদিনের বাংলাদেশ অবজারভারের প্রথম পাতার শিরোনাম ছিল, রাষ্ট্রপতি সায়েম প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হয়েছেন এবং তিন বাহিনীর প্রধান উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক। জিয়া তখন সেনাপ্রধান। রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে তাঁর পুরোপুরি আসা আরও পরের কথা।
এবারের দিনে নতুন কী
এবার দিনটি ঘিরে প্রথমবারের মতো স্মারক ডাকটিকিট এসেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে এ বছর ৪ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১০ টাকা মূল্যমানের একটি স্মারক ডাকটিকিট, ১০ টাকার একটি উদ্বোধনী খাম এবং ৫ টাকার একটি ডেটা কার্ড অবমুক্ত করেছেন। ডাক বিভাগের প্রকাশিত এই ডাকটিকিট দেশের সব ডাকঘরে বিক্রি হবে।
যে দিনের খবর একসময় বেতারতরঙ্গে ছড়িয়েছিল, সেই দিন এখন খামের কোণে চড়ে ঘুরবে ডাকঘর থেকে ডাকঘরে। চট্টগ্রামের ডাকঘরগুলোও তার বাইরে নয়।
ঢাকায় আজ বিএনপির বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। দলীয় সূত্রের বরাতে আগেই জানানো হয়েছিল, এই কর্মসূচিতে নিজে পায়ে হেঁটে অংশ নিয়ে নেতৃত্ব দেবেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
দিবসটি উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে প্রধানমন্ত্রী একটি প্রবাদ মনে করিয়ে দিয়েছেন: অতীত আঁকড়ে থাকলে এক চোখ অন্ধ, অতীত ভুলে গেলে দুই চোখই। তাঁর কথায়, সারাক্ষণ ইতিহাসচর্চায় ডুবে থাকা যেমন ঠিক নয়, তেমনি ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেওয়াও ভুল। বাণীর শেষে তিনি স্লোগান তুলেছেন, ‘দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’।
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাঁর বাণীতে দলমত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দুর্নীতি, বৈষম্য ও ষড়যন্ত্রের অবসান ঘটানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, রাষ্ট্র চলবে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শনে।
ইতিহাসের এই দিনটি নিয়ে অবশ্য দেশে এক সুরে কথা হয়নি কখনো। দিনটিকে বিএনপি ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’, জাসদ ‘সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান দিবস’ এবং আওয়ামী লীগ ‘মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক হত্যা দিবস’ হিসেবে পালন করে। সেদিনের অস্থিরতায় খালেদ মোশাররফসহ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তা নিহত হন। পরে সামরিক আদালতের বিচারে কর্নেল তাহেরের ফাঁসি হয়। সেই বিতর্ক ইতিহাসের পাতায় রয়ে গেছে।
তবু ১৯৭৫ সালের সেই ভোর আর ২০২৬ সালের এই সকালের মধ্যে একটা মিল চোখে পড়ে। সেদিনও মানুষ রাস্তায় নেমেছিল, আজও নামবে। সেদিন খবর এসেছিল বেতারে, আজ আসবে খামে। একান্ন বছরে মাধ্যম বদলেছে, তারিখটা বদলায়নি।

বাংলার পত্রিকা